স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম

১৯৭১ সালে বাঙালি তার কয়েক হাজার বছরের জাতিসত্তার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যে অনন্য স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জন করেছিল প্রচণ্ড এক শক্তিশালী সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে, তারই পূর্বাভাস যেন দেখা দিয়েছিল ১৭৫৭ সালে। রবার্ট ক্লাইভ পলাশির প্রান্তরে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে প্রাসাদ-চক্রান্তের মাধ্যমে হারিয়ে এদেশে সর্বেসর্বা হয়েছিলেন, “বণিকের মানদণ্ড পোহালে শর্বরী দেখা দিয়েছিল রাজদণ্ড” রূপে। তারপর থেকে এই উপমহাদেশের প্রায় দুশো বছরের ইতিহাস ‘ব্রিটিশ ভারতের রাজত্বের ইতিহাস’।

ইংরেজরা  যখন এদেশে তাদের শাসন কায়েম করে তখন এদেশের অনেক সাধারণ বৃত্তিজীবী মানুষ তাদের শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। প্রথম যারা বিদ্রোহ করে তাদের মধ্যে ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের জুমিয়া জনগোষ্ঠীর রাজা জানবক্স খাঁ। চট্টগ্রামে ইংরেজি-জমিদারিত্ব প্রতিষ্ঠা হওয়ার এক দশকের মধ্যেই ১৭৭২ সালে এই সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল, ১৭৯৯ সালে বিদ্রোহ করে মেদিনিপুরের চোয়ার জনগোষ্ঠী। এরপরে একে একে ঘটেছে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, ওয়াহাবি-ফরায়েজি আন্দোলন, তিতুমীরের নেতৃত্বে রায়তদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন, নীলচাষীদের বিদ্রোহ। ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির শতাধিক বছরের শাসনের সমাপ্তি ঘটানো হয় মহান সিপাহী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। এসব আন্দোলন ছিল মুখ্যত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে অত্যাচারিতের বিদ্রোহ। এখানে প্রকৃত অর্থে জাতীয়তাবাদী চেতনা ছিল না।

৳ 1,200

About The Author

জামাল উদ্দিন

জামাল উদ্দিন

ইতিহাসের কিছু হীরক্ষন্ডকে উপহার দিয়েছেন। দুই পর্বে তাঁর প্রনীত দেয়াং পরগনার ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি আমাদের অতিহ্যের সম্পর্কসূত্র বহু সুদূরের। তিনি দ্বিতীয় খ্রীস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত দেয়াঙয়ে প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতার নিদর্শন পন্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান প্রথম সনাক্ত করেন।
জামাল উদ্দিন পেশায় সাংবাদিক। জন্ম ৮মে ১৯৫৯। চট্টগ্রাম জেলা আনোয়ারা থানার শিলাইগড়া গ্রামে। ৬৯-৭০ সালে কৈশোর জীবন থেকে ঘনিষ্ঠভাবে প্রগতিশীল রাজনীতির প্রতি তাঁর আকর্ষন। জামাল উদ্দিন ৭৫’-এ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ড পরবর্তি রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় ভুমিকা পালন করেন। সেই কৈশোরকাল থেকে একই সাথে তিনি বিভিন্ন সংবাদপত্র অ সাময়িকীতে গবেষনামূলক লেখালেখি শুরু করেন। কলেজ জীবন শেষ করে তিনি সাংবাদিকতাকে বেঁচে নিয়েছেন ১৯৮০ সাল থেকে । জাতীয় দৈনিক বাংলা বানী। চট্টগ্রামের স্থানীয় দৈনিক সেবক-এর স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কর্মজীবনের শুরু। পরবর্তীতে জাতীয় দৈনিক ইনকিলাব, দৈনিক রুপালী , দৈনিক খবর ও দৈনিক আজকের কাগজ পত্রিকায় সটাফ রিপোর্টার ও ব্যুরো প্রধান হিসেবে গুরুত্বপুর্ণ পদে ২০০২ সাল পর্যন্ত সাংবাদিকতা জীবন অতিবাহিত করেছেন।

বলাকা প্রকাশনঃ

১৯৭১ সালে বাঙালি তার কয়েক হাজার বছরের জাতিসত্তার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যে অনন্য স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জন করেছিল প্রচণ্ড এক শক্তিশালী সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে, তারই পূর্বাভাস যেন দেখা দিয়েছিল ১৭৫৭ সালে। রবার্ট ক্লাইভ পলাশির প্রান্তরে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে প্রাসাদ-চক্রান্তের মাধ্যমে হারিয়ে এদেশে সর্বেসর্বা হয়েছিলেন, “বণিকের মানদণ্ড পোহালে শর্বরী দেখা দিয়েছিল রাজদণ্ড” রূপে। তারপর থেকে এই উপমহাদেশের প্রায় দুশো বছরের ইতিহাস ‘ব্রিটিশ ভারতের রাজত্বের ইতিহাস’।

ইংরেজরা  যখন এদেশে তাদের শাসন কায়েম করে তখন এদেশের অনেক সাধারণ বৃত্তিজীবী মানুষ তাদের শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। প্রথম যারা বিদ্রোহ করে তাদের মধ্যে ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের জুমিয়া জনগোষ্ঠীর রাজা জানবক্স খাঁ। চট্টগ্রামে ইংরেজি-জমিদারিত্ব প্রতিষ্ঠা হওয়ার এক দশকের মধ্যেই ১৭৭২ সালে এই সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল, ১৭৯৯ সালে বিদ্রোহ করে মেদিনিপুরের চোয়ার জনগোষ্ঠী। এরপরে একে একে ঘটেছে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, ওয়াহাবি-ফরায়েজি আন্দোলন, তিতুমীরের নেতৃত্বে রায়তদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন, নীলচাষীদের বিদ্রোহ। ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির শতাধিক বছরের শাসনের সমাপ্তি ঘটানো হয় মহান সিপাহী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। এসব আন্দোলন ছিল মুখ্যত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে অত্যাচারিতের বিদ্রোহ। এখানে প্রকৃত অর্থে জাতীয়তাবাদী চেতনা ছিল না।

জনগণের এইসব বিদ্রোহে কিছু জমিদার গোষ্ঠীপতি অথবা রাজারা নেতৃত্ব দিয়েছেন। সাধারণ জনগণ এর সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করেনি। “১৭৬০ থেকে ১৮৬০ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সিপাহি বিদ্রোহসহ যে আন্দোলন ও বিদ্রোহ সংঘটিত হয় সেগুলো আলোচনা করলে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। প্রথমত, ভারতের বিশাল জনগোষ্ঠী ব্যাপক আকারে এসব আন্দোলন ও বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেনি। এর প্রধান কারণ দারিদ্র্য, অশিক্ষা, কুসংস্কার জর্জরিত সাধারণ শ্রেণির পক্ষে এ সমস্ত আন্দোলন ও বিদ্রোহের ভাবাদর্শ বুঝে ওঠা সম্ভব ছিল না। এ কারণে আরও ব্যাপক আকারে অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তাও তারা উপলব্ধি করেনি। অবশ্য এই আন্দোলন ও বিদ্রোহসমূহ অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হলেও পরবর্তী যুগের আন্দোলনগুলোতে অনুপ্রেরণা সঞ্চার করেছিল। দ্বিতীয়ত, ভারতবাসীরা সাধারণত মোগল সম্রাটের প্রতি অনুগত ছিলো না। তৃতীয়ত, স্বাদেশিকতা বা স্বদেশপ্রীতি বলতে যা বোঝায় সেটা তখনও ভারতবাসীর মধ্যে দেখা দেয়নি।” বিংশ শতাব্দির সূচনালগ্নে বঙ্গভঙ্গ আইন প্রণয়ন করলে এর বিরুদ্ধে পেশাজীবী শ্রেণির প্রবল আন্দোলন শুরু হয়। বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে এই আন্দোলন স্তিমিত হয়ে এলেও জাতীয়তাবাদী রেশ থেকে যায়। অসহযোগ-খিলাফত ও স্বরাজ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তা বিশের দশকের শেষে ‘পূর্ণ স্বাধীনতা’ আন্দোলনে রূপ নেয়।

১৯৩১ সালে চট্টগ্রাম যুববিদ্রোহকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছিলো ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন। ১৯৩১ সালের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম যুববিদ্রোহের মহানায়ক মাস্টারদা সূর্য সেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়েছিলেন এই চট্টগ্রাম থেকে। বিপ্লবীরা

দু’টি অস্ত্রাগার আক্রমণ অভিযানে ও জালালাবাদ যুদ্ধে ব্রিটিশ সৈনিকদের বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করেছেন। জালালাবাদ যুদ্ধের পরেও ঊনিশশো ত্রিশ থেকে চৌত্রিশ সাল পর্যন্ত এই অসমসাহসী তরুণ বিপ্লবীরা ব্রিটিশ সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত রেখেছিলেন। তাঁরা জানতেন অস্ত্রের জোরে কোনদিন ব্রিটিশ শক্তিকে পরাভূত করা যাবে না। কিন্তু নিজেদের প্রাণোৎসর্গ করে ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়াই ছিল তাঁদের বিদ্রোহের মূল উদ্দেশ্য।

চট্টগ্রাম বিদ্রোহের সে স্ফুলিঙ্গ সারা ভারতবর্ষে প্রচণ্ড দাবানল ছড়িয়ে দিয়ে ইতিহাসে  অম্লান অধ্যায় হয়ে রয়েছে। প্রচণ্ড দমননীতি চালানো সত্ত্বেও চট্টগ্রাম বিদ্রোহের যবনিকা টানতে ব্রিটিশ সরকারকে আরও চার বছর অপেক্ষা করতে হয়। সেই দিনগুলোতে অসম লড়াইয়ে শত্র“র গুলির মুখে বিপ্লবীরা ঢেলেছেন বুকের তাজা রক্ত। তাঁদের অনেকে বরণ করেছেন বীরের মৃত্যু; চিরবিশ্রাম নিয়েছেন প্রিয় জন্মভূমিতে। যাঁরা বেঁচে থাকলেন তাঁদের দাঁড় করানো হলো আসামির কাঠগড়ায়। লোহার গরাদ-ঘেরা কুঠুরিতে তাঁরা তখন যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনের শিকার। কাউকে বরণ করে নিতে হয়েছে যাবজ্জীবন নির্বাসন দণ্ড কিংবা কারো কারো জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো কেটেছে কারাপ্রকোষ্ঠে ঘাতকের প্রতীক্ষায়।

সূর্য সেনের অভিপ্রায় ছিল ভারতকে স্বাধীন করে তুলবেন। বস্তুত তাঁরা ছিলেন স্বপ্নতাড়িত মানুষ। দেশবাসীর মনে সেই স্বপ্নের বীজই তাঁরা রোপণ করতে চেয়েছিলেন দুঃসাহসিক অভিযান দ্বারা।

বিপ্লব এগিয়ে গেল ক্রমশঃ। পাশাপাশি চলল চক্রান্ত, লোভ আর বিশ্বাসঘাতকতা। চট্টগ্রাম জেলে বন্দি মাস্টারদার নিষ্ঠুর নির্যাতনের পর ক্ষতবিক্ষত দেহকে ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি  ফাঁসির রজ্জুতে ঝুলিয়ে দেয় বর্বর ব্রিটিশ শাসক।

এই হত্যাকাণ্ড সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে দেয় আরেক  দাবানল। সে দাবানলে দগ্ধ-ক্ষতবিক্ষত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ অবশেষে পাট গুটাল ইতিহাসের নির্মম অনিবার্য পথ বেয়ে। তারই ধারাবাহিকতায়  ১৯৪৭ সালে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্ম হলো। কিন্তু পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকদের অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে পৃথিবীর ইতিহাসে আবারো নতুনভাবে আন্দোলন, সংগ্রামের সংযোজন ঘটায় বাঙালি জনগোষ্ঠী। ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে মাত্র ৩/৪ বছর পর বাঙালিকে আবারো প্রাণ দিতে হয় ভাষার জন্য।

ইতিহাসের দুর্নিবার ধারায় সে দাবানল থেমে থাকল না।  জাতির আরেক সূর্যসন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলার দামাল সন্তানরা পাকিস্তানি শাসকের বিরুদ্ধে ন্যায্য দাবী আদায়ের লক্ষ্যে আবারো রাজপথে নামে। সেই ষাটের দশক থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন সংগ্রামে চট্টগ্রামের রয়েছে অনন্য অবদান। চট্টগ্রামের ক্ষণজন্মা পুরুষ এম এ আজিজ, জহুর আহমদ চৌধুরী, এম আর সিদ্দিকী, এম এ হান্নান, জানে আলম দোভাষ, মানিক চৌধুরী, আবদুল্লাহ আল হারুন চৌধুরী, এম এ মান্নান,  বিধানকৃষ্ণ সেনসহ অনেকেই বীরত্বের সাথে গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জনতার কাতারে সামিল হয়ে। সে ইতিহাস অনেক গৌরবদীপ্ত ও ঘটনাবহুল।

নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে গড়িয়ে এলো ১৯৭১-এর মার্চ। ২৫ মার্চ রাত সাড়ে নয়টায় সারা দেশের মধ্যে সর্বপ্রথম পাকিস্তানিবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সূচিত হয় এই  চট্টগ্রাম থেকেই। ইপিআর এ্যাডজুটেন্ট ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম, পুলিশ বাহিনীর কর্ণধার এসপি শামসুল হক নিজ নিজ বাহিনী নিয়ে শত্র“বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তারপর থেকে দীর্ঘ নয় মাস বাংলার দামাল ছেলেরা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে দেশকে শত্র“মুক্ত করে। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পৃথিবীর বুকে হাজার বছরের বাঙালির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হলÑ ‘বাংলাদেশ’। এই অর্জনে চট্টগ্রামের অবিস্মরণীয় ভূমিকা ও অবদান রয়েছে।

কিন্তু চট্টগ্রামের বীরত্বগাথা ইতিহাসের আলোকে পূর্ণাঙ্গ কোন ইতিহাস আমাদের হাতে নেই। একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস গ্রন্থিত হওয়া প্রয়োজন মনে করে আমি আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা শুরু করেছিলাম আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগে। তার কারণ ছিল স্বাধীনতার দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় ধীরে ধীরে অনেক দুর্লভ তথ্য-উপাত্ত হারিয়ে যেতে বসেছে।  তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধে সংশ্লিষ্ট জীবিত যাঁরা তাঁদের অনেকেই প্রাকৃতিক  নিয়মে আমাদের কাছ থেকে একে একে বিদায় নিচ্ছেন। বয়সের ভারে অনেকে ন্যুব্জ, তাঁদের স্মৃতি ঝাপসাপ্রায়। এসব জীবন্ত তথ্য-উপাত্ত বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আগেই একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনার তাড়নায় ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিলাম। সৃজন ও সমীক্ষার ক্ষেত্রে মানুষ সবসময় সন্ধান করে পূর্বপুরুষদের, খুঁজে বেড়ায় অতীতকে। অতীত শক্তি যোগায় নতুন পথে এগুবার, পাথেয় হয় পথ চলার। তাই এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। অসাধারণ কিছু তৈরী করার বাসনা নিয়ে নয়, শুধু চেয়েছি বিস্মৃতির অতল থেকে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসকে তুলে ধরতে। আরো চেষ্টা করেছি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে সুষ্ট কিছু অপ্রিয় মিথ্যাচার ও বিভ্রান্তি দূর করতে। এটাকে আমি পেশাগত নৈতিক কর্তব্য বলে মনে করেছি।

এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, ব্রিটিশ আমল থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত চট্টগ্রাম শহরের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস এ গ্রন্থে তুলে ধরা হয়েছে। তাই গ্রন্থের নামকরণ করা হয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম শহর’।

এই গ্রন্থের জন্য কাজ করার সময় চট্টগ্রাম শহরের গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনে অংশ নেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে দেখা গেল তাঁরা ঘটনাস্থল, তারিখ, সময় ও সহযোদ্ধাদের নামের ক্ষেত্রে এক-একসময় এক-একরকম তথ্য দিচ্ছেন। তাই তাঁদের দেয়া তথ্যের যথার্থতা যথাসম্ভব যাচাই-বাছাই করে উপস্থাপন করা হয়েছে। আমি বিশেষভাবে উপলব্ধি করেছি চট্টগ্রাম শহরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেয়া দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হাজার হাজার নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের কথা। এরা করাচী থেকে গোপনে অস্ত্র বয়ে নিয়ে-আসা এমভি সোয়াত জাহাজকে চট্টগ্রাম বন্দরে অবরোধ করে রাখেন। ২৪ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অস্ত্র খালাস করতে গেলে তাঁরা বাধা দেন। বুক পেতে দেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কামান ও মেশিনগানের গুলিবর্ষণের মুখে। তাঁদের রক্তে লাল হয়ে যায় কর্ণফুলী নদীর পানি। এ-ভাবেই চট্টগ্রাম থেকে শুরু হয় হানাদার বাহিনীর বিরূদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ। এই প্রতিরোধ যোদ্ধা সাধারণ মানুষেরা রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না। ওইদিন আত্মাহুতি  দেয়া তিন শতাধিক সাধারণ মানুষের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন চট্টগ্রাম বন্দর, স্টীল মিল ও আশেপাশের কলকারখানার খেটে-খাওয়া সাধারণ মানুষ। এদের নাম আমরা জানি না, অনেকের নাম ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে গেছে।

সাড়ে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে কৃষক-শ্রমিক-কামার-কুমোর এবং সমাজের অনগ্রসর শ্রেণির মানুষ, এমনকি নারীদেরও বীরত্বগাথার অনেক উপাখ্যান আছে। আমি এগুলোও তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

আমি এখানে বলে রাখছি যে এটি পূর্ণাঙ্গ কোন ইতিহাস নয়। তারপরও আমি সাধ্যমত চেষ্টার ত্র“টি করিনি। অজ্ঞাতে পরিবেশিত কোন ভুল তথ্য কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় বাদ পড়ে থাকলে অনুগ্রহ করে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তসহ অবগত করালে গ্রন্থটির পরবর্তী সংস্করণে তা সংযোজন করা হবে এবং যথার্থ ইতিহাস প্রণয়নের এই ধারাটি আরো সমৃদ্ধ হবে। আরো একটি বিষয় উল্লেখ করতে হয়, তা হলোÑ গ্রন্থে রেফারেন্স হিসেবে বিভিন্ন গ্রন্থ, পত্র-পত্রিকা, প্রামাণ্য দলিল ও গবেষণাপত্র থেকে  যে সব উদ্ধৃতি দিয়েছি, সেগুলোর যথার্থতা বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরশীল বলে  মনে করি।  তবে কোন কিছুই শতভাগ গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরশীল হতে পারে না।

গ্রন্থ রচনায় বানানের ক্ষেত্রে যতদূর সম্ভব বাংলা একাডেমীর প্রস্তাবিত নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন সাংবাদিক, ছড়াকার নূর মোহাম্মদ রফিক এবং সাংবাদিক ও লেখক প্রদীপ খাস্তগীর। আমি তাঁদের কাছে অশেষ কৃতজ্ঞ।

Reviews

There are no reviews yet.

Be the first to review “স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম”

Your email address will not be published. Required fields are marked *