বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলের ভাষা বৈচিত্র্য পরিপ্রেক্ষিত ধ্বনিতত্ত্ব/The Dialectical Variety of Bengali Language in Greater Noakhali : A Phonological Perspective

গ্রন্থ সংশ্লিষ্ট কথা

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জনপদ বৃহত্তর নােয়াখালী। এটি বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে কোন স্বতন্ত্র জনপদ নয়। পুরাে জনপদটি বাংলা ভাষার অধিভুক্ত হলেও প্রমিত বাংলা ভাষার সঙ্গে এর ধ্বনিগত স্বাতন্ত্র রয়েছে। এই ধ্বনিগত স্বাতন্ত্রই এই অঞ্চলের অধিবাসীদের ভাষায় অনেকখানি ভিন্নতা এনে দিয়েছে।

এই জনপদের ভাষার উপর স্যার জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ার্সনই প্রথম দৃষ্টি দিয়েছিলেন। তাঁর পরিচালিত ভারতবর্ষের প্রথম ভাষা জরিপে নােয়াখালীর ভাষাকে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় উপশ্রেণিতে স্থান দিয়েছিলেন। এরপর গােপাল হালদার প্রাতিষ্ঠানিক রূপে এই উপভাষা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। যদি গ্রিয়ার্সনের সময় থেকে এই উপভাষার চর্চা কাল ধরা হয়, তাহলে বলা যায়, এই উপভাষার আনুষ্ঠানিক চর্চা কাল প্রায় একশত দশ বছর। এই সময়ের মধ্যে ভাষা-বৈচিত্র্যের পরিপ্রেক্ষিতে এই উপভাষার উল্লেখ করার মতাে ধ্বনিতাত্ত্বিক কোন আলােচনা চোখে পড়ে না।

কালের পরিক্রমায় গ্রিয়ার্সনের পরিচিতিমূলক আলােচনার পরে বিভিন্ন গবেষকের নানামাত্রিক ভৌগােলিক আলােচনা লক্ষ করা যায়। কিন্তু এদের কোনটি এই উপভাষার সামগ্রিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং বৈচিত্র্য অনুসন্ধানের জন্য যথেষ্ট বলে বিবেচিত হয়নি। যেহেতু ভাষা-বৈচিত্র্যের পরিপ্রেক্ষিতে এই উপভাষার ধ্বনিতাত্ত্বিক স্বাতন্ত্র নিয়ে আলােচনা হয়নি, সেহেতু এ উপভাষার ধ্বনিতাত্ত্বিক আলােচনার সুযােগ থেকে যায়। তাছাড়া এ উপভাষার উপর পরিচালিত জরিপ এবং বিভিন্ন সময়ের আলােচনা নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্কও চোখে পড়ে। এজন্যে বৃহত্তর নােয়াখালীর ভাষা নিয়ে যে সব আলােচনা দেখা যায় কোন আলােচনাকে পূর্ণাঙ্গ বলে মনে হয় না। তাই এ অঞ্চলের ভাষা-বৈচিত্র্যের পরিপ্রেক্ষিতে এর বনিতাত্ত্বিক আলােচনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছি।

| এই গ্রন্থের আলােচনায় প্রচলিত ব্যাকরণের পাশাপাশি ভাষাতত্ত্বের ঐতিহাসিক, বর্ণনামূলক ও তুলনামূলক ধারার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছি এবং এ উপভাষার সঙ্গে প্রমিত বাংলার পার্থক্য তৈরিতে স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনির বিচারে ইমত বাংলার ধ্বনিতাত্ত্বিক এলাকায়ও প্রবেশ করেছি। এক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য হলাে আধুনিক ধ্বনিতত্ত্বের পরিপ্রেক্ষিতে এই উপভাষার স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি তর করা। এ বিচার-বিশ্লেষণে প্রাপ্ত নির্যাস গ্রন্থের উপসংহারে দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের অন্যান্য উপভাষার তুলনায় এই উপভাষায় স্বরধ্বনি ও। ব্যঞ্জনধ্বনির আধিক্য পরিলক্ষিত হয় না। মাত্র ৭টি স্বরধ্বনিমূল এবং ২৪টি ব্যঞ্জনধ্বনিমূলের সমন্বয়ে এ উপভাষার ভাষিক অবয়ব তৈরি হয়েছে। এর স্বর ও ব্যঞ্জনধ্বনির বৈশিষ্ট্য পূর্ববঙ্গীয় ধ্বনিমূলীয় চরিত্রের। এর স্বরধ্বনির অতিরিক্ত ধ্বনিমূলীয় বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে স্বর-দীর্ঘতা, স্বরাঘাত, শ্বাসাঘাত, স্বরতরঙ্গ, মীড়স্বর প্রভৃতির রূপ প্রমিত বাংলার মূলরূপ থেকে ভিন্নতর। এই ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও বৃহত্তর নােয়াখালীর উপভাষার স্বরতরঙ্গজাত বৈচিত্র্য বাংলা ভাষার মৌলিক বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে সৃষ্ট।

নােয়াখালীর উপভাষায় প, ফ, শ, স ইত্যাদি ধ্বনি উচ্চারণে বিশেষত্ব আছে। এ উপভাষায় শিসধ্বনি শ, স সংরক্ষিত এবং প, ফ এর শিসধ্বনিরূপে এদের স্থলে হ উচ্চারণ প্রবণতা লক্ষ করার মতাে। কয়েকটি ক্ষেত্রে শ, স শব্দারম্ভে হ তে রূপান্তরিত হয়। পূর্ববাংলার বৈশিষ্ট্য হিসেবে নােয়াখালী উপভাষায় অপিনিহিতির প্রভাব লক্ষ করা যায়। এতে আরবি, ফারসি, উর্দু, পর্তুগিজ ভাষার প্রভাব লক্ষ করা যায়। আরবি-ফারসির প্রভাবে এ উপভাষার চ-বর্গীয় চ, ছ, জ, ঝ ধ্বনিসমূহ শিস ও দন্তৌষ্ঠ উচ্চারণ পরিলক্ষিত হয়। এর একটি বিশেষ প্রবণতা হলাে, বর্গের মহাপ্রাণ ধ্বনিগুলাের প্রায়ই নিয়মিত মহাপ্রাণতার অনুপস্থিতি।

| নােয়াখালী উপভাষার কথ্যরূপ অনেকটা প্রমিত বাংলার কাছাকাছি। তাই লিখিত রূপের সঙ্গে এর ব্যবধান সামান্য। কিন্তু এর ভাষিক-বৈচিত্র্যের কারণ এর ধ্বনি উচ্চারণে দ্রুত উচ্চারণ প্রবণতা ও সহজীকরণ প্রক্রিয়া। এর একেকটা ধ্বনির দ্রুত উচ্চারণ ও সহজীকরণের ফলে এর আলাদা একটি ধ্বনিগত বৈচিত্র্য গড়ে উঠেছে। এইসব বিষয়ের প্রাসঙ্গিক আলােচনায় রচিত হলাে ‘বৃহত্তর নােয়াখালী অঞ্চলের ভাষা বৈচিত্র্য : পরিপ্রেক্ষিত ধ্বনিতত্ত্ব।

গ্রন্থটি ছিল এম.ফিল. পর্যায়ের অভিসন্দর্ভ। মূল বিষয়ের কোন মৌলিক পরিবর্তন না করে এটি প্রকাশিত হলাে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গবেষণা নির্দেশক অধ্যাপক ড. মােহাম্মদ আবুল কাসেম স্যারকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি । যাঁদের উপদেশ ও সহযােগিতায় উপকৃত হয়েছি তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই।

১ মে, ২০১৮ বাংলা বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

মােহাম্মদ নেয়ামত উল্যাহ ভূঁইয়া

সহকারী অধ্যাপক

 

৳ 400

About The Author

মোহাম্মদ নেয়ামত উল্যাহ ভূঁইয়া

মোহাম্মদ নেয়ামত উল্যাহ ভূঁইয়া

মােহাম্মদ নেয়ামত উল্যাহ ভূইয়া,
সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম
বিশ্ববিদ্যালয়।
তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের
উচ্চশিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় বৃত্তিপ্রাপ্ত
পি-এইচ.ডি. গবেষক। কুণ্ডেশ্বরী গার্লস
কলেজ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়
কলেজ (চুয়েট কলেজ), চট্টগ্রাম সরকারি
সিটি কলেজ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে
শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু
করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে
২০১৪ সালে এম.ফিল, ডিগ্রি অর্জনের
পূর্বে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর উভয়
পরীক্ষায় প্রথম স্থানসহ সর্বোচ্চ সিজিপিএ
অর্জন করেন। উভয় কৃতিত্বের জন্য তিনি
নূতন চন্দ্র সিংহ' এবং ‘যােগেশ চন্দ্র’ বৃত্তি
লাভ করেছিলেন।
তাঁর জন্মস্থান ফেণী। বাবা: মৃত শেখ
আহমদ ভূইয়া, মা: হাজেরা খাতুন, বাড়ি: কাবিল ভূইয়া বাড়ি,
গ্রাম: পশ্চিম পাঠান গড়, ডাকঘর: পাঠান
নগর, থানা: ছাগলনাইয়া, জেলা: ফেণী।

Reviews

There are no reviews yet.

Be the first to review “বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলের ভাষা বৈচিত্র্য পরিপ্রেক্ষিত ধ্বনিতত্ত্ব/The Dialectical Variety of Bengali Language in Greater Noakhali : A Phonological Perspective”

Your email address will not be published. Required fields are marked *