বার আউলিয়ার চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম সামুদ্রিক বন্দর, পুরাকাল থেকেই চট্টগ্রামের সামুদ্রিক বন্দরে বিদেশি বণিকদের যাতায়াত ছিল।  হুগলী জেলার সপ্তগ্রাম বা মেদিনীপুর জেলার তমলুক ও পিপলির বন্দরের মর্যাদা চট্টগ্রামের তুলনায় অনেক কম ছিল। চট্টগ্রাম বন্দর এই অঞ্চলে সর্বশ্রেষ্ঠ বন্দররূপে পরিগণিত ছিল। কলকাতা বন্দরের তখনও পত্তন হয় নি। সেকালে আরব দেশের লোকেরা ব্যবসা-বাণিজ্যে পূর্ব থেকে তৎপর ছিল, এমনকি তারা প্রাচ্যের ব্যবসা-বাণিজ্যে একচেটিয়া অধিকার বিস্তার করেছিল। যে কারণে আরবে ইসলাম বিস্তারের সাথে সাথে, বলতে গেলে  ইসলামের একেবারে শিশুকাল থেকেই সুদূর আরব রাজ্য হতে ইসলামের বাণী এসে যায় সরাসরি চট্টগ্রামের মাটিতে।

আরবরা যখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তৎপর ছিল, তখন অনেক আরবীয় মুসলমান ভৌগোলিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ, বিভিন্ন দ্রব্য-সামগ্রীর উৎপত্তি স্থল, মূল্যমান এবং আমদানি-রপ্তানি বিষয়ক খুটিনাটি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন এবং বণিকদের সুবিধার্থে তাদের সংগৃহীত তথ্যাদি লিপিবদ্ধ করেন। এসব আরব ভৌগোলিকের মধ্যে সুলায়মানের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য। কারণ, তিনিই সর্বপ্রথম আনুমানিক ৮৫১ খ্রিস্টাব্দে রচনা করেন  ‘সিলসিলাত-উত-তাওয়ারীখ’ নামক গ্রন্থ। উক্ত গ্রন্থে তিনি এশিয়ার বিভিন্ন উপকূলবর্তী বন্দরসমূহ এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক বিষয়ে আলোকপাত করেন।

তারপর ইবনে খুরদাদবিহ (মৃত্যু ৯১২ খ্রি) রচনা করেন ‘কিতাব-উল-মসালিক-আল-মমালিক’ নামক গ্রন্থ। উক্ত গ্রন্থে তিনি আরব দেশ থেকে চীন সাম্রাজ্য পর্যন্ত বাণিজ্যপথ বর্ণনা করেন এবং এতদসঙ্গে সামুদ্রিক বন্দরসমূহের বর্ণনাও দেন। আল ইদ্রিসী (জন্ম একাদশ শতাব্দীর শেষ পাদে), আল মাসুদী (মৃত্যু ৯৫৬ খ্রি) ইবনে খুরদাদবিহ অনুসরণে বাণিজ্যপথের বর্ণনা দিয়েছেন।  সুলায়মান তাঁর বর্ণিত দেশসমূহ কয়েকবার সফর করেছিলেন।১

৳ 200

About The Author

জামাল উদ্দিন

জামাল উদ্দিন

ইতিহাসের কিছু হীরক্ষন্ডকে উপহার দিয়েছেন। দুই পর্বে তাঁর প্রনীত দেয়াং পরগনার ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি আমাদের অতিহ্যের সম্পর্কসূত্র বহু সুদূরের। তিনি দ্বিতীয় খ্রীস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত দেয়াঙয়ে প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতার নিদর্শন পন্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান প্রথম সনাক্ত করেন।
জামাল উদ্দিন পেশায় সাংবাদিক। জন্ম ৮মে ১৯৫৯। চট্টগ্রাম জেলা আনোয়ারা থানার শিলাইগড়া গ্রামে। ৬৯-৭০ সালে কৈশোর জীবন থেকে ঘনিষ্ঠভাবে প্রগতিশীল রাজনীতির প্রতি তাঁর আকর্ষন। জামাল উদ্দিন ৭৫’-এ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ড পরবর্তি রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় ভুমিকা পালন করেন। সেই কৈশোরকাল থেকে একই সাথে তিনি বিভিন্ন সংবাদপত্র অ সাময়িকীতে গবেষনামূলক লেখালেখি শুরু করেন। কলেজ জীবন শেষ করে তিনি সাংবাদিকতাকে বেঁচে নিয়েছেন ১৯৮০ সাল থেকে । জাতীয় দৈনিক বাংলা বানী। চট্টগ্রামের স্থানীয় দৈনিক সেবক-এর স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কর্মজীবনের শুরু। পরবর্তীতে জাতীয় দৈনিক ইনকিলাব, দৈনিক রুপালী , দৈনিক খবর ও দৈনিক আজকের কাগজ পত্রিকায় সটাফ রিপোর্টার ও ব্যুরো প্রধান হিসেবে গুরুত্বপুর্ণ পদে ২০০২ সাল পর্যন্ত সাংবাদিকতা জীবন অতিবাহিত করেছেন।

বলাকা প্রকাশনঃ

বার আউলিয়ার চট্টগ্রাম-
ইসলাম প্রচার ও বার আউলিয়ার চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম সামুদ্রিক বন্দর, পুরাকাল থেকেই চট্টগ্রামের সামুদ্রিক বন্দরে বিদেশি বণিকদের যাতায়াত ছিল।  হুগলী জেলার সপ্তগ্রাম বা মেদিনীপুর জেলার তমলুক ও পিপলির বন্দরের মর্যাদা চট্টগ্রামের তুলনায় অনেক কম ছিল। চট্টগ্রাম বন্দর এই অঞ্চলে সর্বশ্রেষ্ঠ বন্দররূপে পরিগণিত ছিল। কলকাতা বন্দরের তখনও পত্তন হয় নি। সেকালে আরব দেশের লোকেরা ব্যবসা-বাণিজ্যে পূর্ব থেকে তৎপর ছিল, এমনকি তারা প্রাচ্যের ব্যবসা-বাণিজ্যে একচেটিয়া অধিকার বিস্তার করেছিল। যে কারণে আরবে ইসলাম বিস্তারের সাথে সাথে, বলতে গেলে  ইসলামের একেবারে শিশুকাল থেকেই সুদূর আরব রাজ্য হতে ইসলামের বাণী এসে যায় সরাসরি চট্টগ্রামের মাটিতে।

আরবরা যখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তৎপর ছিল, তখন অনেক আরবীয় মুসলমান ভৌগোলিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ, বিভিন্ন দ্রব্য-সামগ্রীর উৎপত্তি স্থল, মূল্যমান এবং আমদানি-রপ্তানি বিষয়ক খুটিনাটি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন এবং বণিকদের সুবিধার্থে তাদের সংগৃহীত তথ্যাদি লিপিবদ্ধ করেন। এসব আরব ভৌগোলিকের মধ্যে সুলায়মানের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য। কারণ, তিনিই সর্বপ্রথম আনুমানিক ৮৫১ খ্রিস্টাব্দে রচনা করেন  ‘সিলসিলাত-উত-তাওয়ারীখ’ নামক গ্রন্থ। উক্ত গ্রন্থে তিনি এশিয়ার বিভিন্ন উপকূলবর্তী বন্দরসমূহ এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক বিষয়ে আলোকপাত করেন।

তারপর ইবনে খুরদাদবিহ (মৃত্যু ৯১২ খ্রি) রচনা করেন ‘কিতাব-উল-মসালিক-আল-মমালিক’ নামক গ্রন্থ। উক্ত গ্রন্থে তিনি আরব দেশ থেকে চীন সাম্রাজ্য পর্যন্ত বাণিজ্যপথ বর্ণনা করেন এবং এতদসঙ্গে সামুদ্রিক বন্দরসমূহের বর্ণনাও দেন। আল ইদ্রিসী (জন্ম একাদশ শতাব্দীর শেষ পাদে), আল মাসুদী (মৃত্যু ৯৫৬ খ্রি) ইবনে খুরদাদবিহ অনুসরণে বাণিজ্যপথের বর্ণনা দিয়েছেন।  সুলায়মান তাঁর বর্ণিত দেশসমূহ কয়েকবার সফর করেছিলেন।১

আরাকান রাজবংশীয় উপাখ্যান রাজদা-তুয়ে এমন একটি আখ্যান উল্লেখিত আছে :

“এই সময়ের শেষ ভাগে কান-রা-দজা-গীর বংশধর মহতইঙ্গ ত চন্দয়ত সিংহাসনে আরোহণ করেন। এই রাজা ২২ বছর রাজত্ব করার পর মারা যান। কথিত আছে, তাঁর সময়ে (৭৮৮-৮১০খ্রি) কয়েকটি কুল অর্থাৎ বিদেশী জাহাজ রনবী দ্বীপের সঙ্গে সংঘর্ষে ভেঙ্গে পড়ে এবং জাহাজের মুসলমান আরোহীদেরকে আরাকানে পাঠানো হয়। সেখানে তারা গ্রামাঞ্চলে বসবাস শুরু করেন।২  আরব বণিকরা যে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে ব্যবসা -বাণিজ্য চালাত, এ তার একটি বড় প্রমাণ। আরাকান উপকূলে ব্যবসা চালালে চট্টগ্রাম বন্দর মোটেই বাদ পড়ে না।

এই উপাখ্যানের অন্য জায়গায় লিপিবদ্ধ আছে যে, ২৫৩ খ্রিস্টাব্দে আরাকানের রাজা সুলত ইঙ্গ চন্দ ‘সুরতন’ বিজয়ে বের হন এবং সে দেশে একটি বিজয়স্তম্ভ স্থাপন করেন। রাজার উক্তি অনুসারে তার নাম হয় চেত্তগৌং অর্থাৎ যুদ্ধ করা অনুচিত।৩ অনেকে মনে করেন যে, ‘সুরতন’ শব্দটি ‘সুলতান’ শব্দের আরাকানী সংস্করণ এবং তদনুসারে তাঁরা বলেন যে, চট্টগ্রামে ঐ সময়ে মুসলমানরা একটি আরব রাষ্ট্র গঠন করেছিলেন।৪  চট্টগ্রাম বন্দরের  সঙ্গে যে আরবীয় মুসলমান বণিকদের বাণিজ্যিক  যোগাযোগ ছিল তা নিঃসন্দেহ, কিন্তু এ প্রসঙ্গে ডক্টর আবদুল করিম বলেন যে, চট্টগ্রামে মুসলমানরা আরব রাষ্ট্র গঠন করেছিল কিনা সন্দেহের অতীত নয়। একটিমাত্র শব্দ ‘সুরতন’ যার অর্থ এখনও নিঃসন্দেহভাবে পরিস্ফুট হয় নি, তার উপর ভিত্তি করে কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত আরাকান বংশাবলী পড়ে মনে হয় ‘সুরতন’ শব্দটি সুলতান-এর বিকৃত রূপ হতে পারে না; তা অধুনালুপ্ত কোন একটা স্থানের নাম সূচিত করে। ৫

উপরোক্ত আলোচনায় দেখা যায় যে, খ্রিস্টীয় ৮ম/৯ম শতাব্দীতে চট্টগ্রামের সঙ্গে আরবীয় মুসলমান বণিকদের যোগাযোগ ছিল। আরব্য বণিকরা চট্টগ্রামে স্বাধীন রাজ্য গঠন না করলেও আরবদের যোগাযোগের ফলে চট্টগ্রামের সংস্কৃতিতে তাদের প্রভাব এখনও পরিলক্ষিত হয়। চট্টগ্রামী শব্দে প্রচুর আরবী শব্দ ব্যবহৃত হয় : চট্টগ্রামী ভাষার ক্রিয়াপদের পূর্বে ‘না’ সূচক শব্দ ব্যবহারও আরবী ভাষার প্রভাবের ফল। অনেক চট্টগ্রামী পরিবার আরব বংশোদ্ভূত বলে দাবী করেন। চট্টগ্রামে একাধিক কদম রসুল-এর অস্তিত্ব দেখা যায়।৬

যাই হোক না কেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সূত্রে আরব্য বণিকদের চট্টগ্রাম আগমনের ধারাবাহিকতায় ইসলামের শিশুকাল থেকেই মুসলিমের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল চট্টগ্রামে।  রসুলুল্লাহর (দঃ) মদিনায় হিজরতের আগে অর্থাৎ মক্কা অবস্থানকালেই ৬১৭ খ্রিস্টাব্দে আবু ওয়াক্কাস মালিক ইবনে ওয়াহাব (রাঃ) এর নেতৃত্বে হযরত তামীম আনছারি (রাঃ), হযরত কায়েস ইবনে ছায়ফরি (রাঃ), হযরত উরয়াহ ইবনে আছম শাহ (রাঃ), হযরত আবু কায়েস ইবনে হারিস (রাঃ) সুদূর আরবরাজ্য থেকে বাদশাহ নাজ্জাসির দেওয়া জাহাজে করে সামন্দর (চট্টগ্রাম) বন্দরে এসেছিলেন ইসলাম প্রচারে। জানা যায়, তাঁরা এ বন্দরে চারবছর অবস্থান করে ইসলাম প্রচারে রত ছিলেন। সামন্দর (চট্টগ্রাম) থেকেই তাঁরা চীন দেশে চলে যান। খলিফা হযরত উমরের আমলে (১৩-১৪ হিজরি) আরব থেকে সাতজন তাবেয়ী মুসলিম ইসলাম প্রচারে আসেন সামন্দর (চট্টগ্রাম) বন্দরে।

এঁরা হলেন হযরত মোহাম্মদ মামুন (রাঃ), হযরত মোহাম্মদ মোহাইমেন (রাঃ), হযরত মোহাম্মদ আবু তালেব (রাঃ), হযরত মোহাম্মদ মর্তুজা (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ), হযরত হামিদ উদ্দিন (রাঃ), হযরত হোসেন উদ্দিন (রাঃ)। বলা হয়ে থাকে যে, এই সাহাবিরা ইসলাম ধর্মে নবাগত মুসলমানদের নিয়ে সপ্তম সালের মাঝামাঝি কোন এক সময়ে দেয়াঙে রমজানের ঈদের নামাজ আদায় করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে এরূপ পাঁচটি ইসলাম প্রচারক দল চট্টগ্রামে আগমন করার প্রমাণ পাওয়া যায়।৭

এভাবে সাহাবার হাতে ইসলাম কবুল করা এদেশীয় তাবেয়ীগণ  এবং পরবর্তীকালে আগত আরব বণিক ও সুফীদের মাধ্যমে বাংলা তথা চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচারিত হয় হিজরী সপ্তম  শতকের ২য় দশক থেকে ১২০২ সাল পর্যন্ত। ৮ প্রবল জনশ্র“তি রয়েছে যে, হযরত বায়েজিদ বোস্তামী  (রহঃ) ৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে ও ফরিদউদ্দিন গঞ্জশকর ( ১১৭৭-৮৯) চট্টগ্রামে  অবস্থান করে জনসাধারণের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছান।৯

দশম শতকের বিশ্ববিশ্র“ত আরব ভূগোলবিদ আবুল কাসিম উবায়দুল্লাহ বিন খুরদাদবীহের  ( মৃত্যু ৯১২ খ্রি) বর্ণনায় জানা যায় যে, ইসলাম-পূর্ব যুগেই আরব-ইয়েমেনী-আবিসিনীয় বণিকেরা  সন্দ্বীপের দক্ষিণ উপকূল থেকে এক দিনের পথ উত্তরে  এবং কামরুত (কামরূপ) থেকে ১৫/২০ দিনের পথ দক্ষিণে গংগা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার সংগম স্থলের পার্শ্বে  ‘সামন্দর’ (চট্টগ্রাম) বন্দরে আসা-যাওয়া করতেন।১০

বিশ্ববিখ্যাত আরব পর্যটক ও ভূগোলবিদ আবু আবদুল্লা আল ইদ্রিসীও (মৃত্যু ১১৬৪) উল্লেখ করেছেন যে, ‘সামনদার’ (চট্টগ্রাম) ছিল মুসলিম আরবদের প্রাচ্য বাণিজ্যে পণ্য সংগ্রহের একটি প্রধান বন্দর। তারা এখান থেকে চাউল এবং আভ্যন্তরীণ নৌ-পথে কামরূপ হতে আগর ও চন্দন কাষ্ঠ সংগ্রহ করতেন। ১১  আরব বণিকেরা সরন্দীর (শ্রীলংকা) হতে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর অনুকুলে ৪ দিনে সামন্দর (চট্টগ্রাম) পৌঁছতেন এবং সেখান থেকে লোহিত-সাগর  (মোমেনশাহী-সিলেটের হাওর অঞ্চল) হয়ে লোহিত (ব্রহ্মপুত্র) নদীর উজান ঠেলে ১৫/২০ দিনে কামরূপ পৌঁছতেন। বণিকদের জাহাজে আগত সুফী-দরবেশদের সঙ্গ লাভ করে  চট্টগ্রামে নওমুসলিমের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে চট্টগ্রাম-আরব সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠতে থাকে এবং চট্টগ্রামের অভ্যন্তরে নদী-নালা-খাল-বিলের তীর ছুঁয়ে বিদ্যমান সবুজ-শ্যামল পল্লীপ্রান্তের নানা স্থানে অসংখ্য ছোট ছোট মুসলিম জনবসতি গড়ে ওঠে।

উত্তর ও পশ্চিম বাংলা গুপ্ত সম্প্রদায়ভুক্ত হবার আগে-পরে কয়েক শতাব্দী ধরে পরমতসহিষ্ণু ও ধর্মীয় প্রশ্নে উদারনীতির অনুসারী ভদ্র বংশ, খড়ক বংশ, চন্দ্র বংশ, দেব বংশ ও পাল বংশীয় বৌদ্ধ শাসকদের আমলে বাংলা মুলকসহ চট্টগ্রাম তৎকালীন বিশ্বে বৌদ্ধ শিক্ষা-সংস্কৃতি-সভ্যতার পীঠস্থান ছিল। ঐ সময়েই দেয়াঙ পাহাড়ের ঝিওরী নামক স্থানে বিশাল পাহাড়ী এলাকাজুড়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল চট্টগ্রাম পণ্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু নানা যুদ্ধবিগ্রহের কারণে এসব ইতিহাস কালের গর্ভে হারিয়ে যায়।  তেমনি সপ্তম শতক থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়ে চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গড়ে-ওঠা মুসলিম জনবসতিগুলোর ইতিহাসও কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে।

মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা ঈসায়ী ১৩৪০ সালে এবং পর্তুগীজ পর্যটক দুয়ার্তে বারবোসা ১৫১৮ সালে চট্টগ্রাম বন্দর সফর করে দেখতে পান যে, বন্দরের অধিকাংশ বাসিন্দা ছিলেন আরব, আবিসিনীয় ও ইরানী মুসলমান। চট্টগ্রাম বন্দরের আশে-পাশে তারা সপরিবারে বসত করেন এবং এদেশ থেকে  কাপড়, চিনি ও অন্যান্য পণ্যসামগ্রী  সংগ্রহ করে করোমণ্ডল, মালাবার, কাম্বে, পেগু, সিংহল, মালাক্কা, সুমাত্রা প্রভৃতি দেশে রফতানি করেন।১২

ইবনে বতুতা এই বন্দর থেকেই চীনা জাহাজে চড়ে চীন দেশ গমন করেন।১৩  ত্রয়োদশ শতকের গোড়ার দিকে বখতিয়ার খলজী নদীয়া আক্রমণ করেন এবং লখ্নোওতিতে স্বীয় রাজধানী স্থাপন করে বাংলাদেশে মুসলমান রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন। চট্টগ্রামে মুসলমান শাসন প্রবর্তিত হয় তারও প্রায় দেড়শত বছর পরে। সোনার গাঁও-এর স্বাধীন  সুলতান ফখর-উদ্দিন মুবারক শাহ (১৩৩৮-১৩৪৯ খ্রি) সর্বপ্রথম চট্টগ্রাম জয় করেন এবং চট্টগ্রামকে মুসলমানদের শাসনাধীনে আনয়ন করেন।১৪ প্রকৃতপক্ষে এই সময় থেকে চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচার আরম্ভ হয়। সুলতান ফখর-উদ-দীন মুবারক শাহ কর্তৃক চট্টগ্রাম বিজয়ের সমসাময়িক কোন বিবরণ পাওয়া এখন দুষ্কর।

Reviews

There are no reviews yet.

Be the first to review “বার আউলিয়ার চট্টগ্রাম”

Your email address will not be published. Required fields are marked *