বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধে মাইজভান্ডার দরবার শরীফ/BANGLADESHER SHAWADHINATA SANGRAM O MUKTIJUDDHE MAIZBHANDAR DDARBAR SHARIF

প্রাককথন

মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ আমার বাড়ীর কাছে আরশী নগর’। সেই কৈশাের থেকে এই আধ্যাত্মিক কেন্দ্রটাকে দেখে আসছি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের মিলনস্থল রূপে । এ যেন এক বিশাল শান্তি ও আশ্রয়ের চাদোয়া, যেখানে মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান-জুমিয়াচাকমা-মার্মা-টিপরা প্রভৃতি সকল জাতের ও শ্রেণীর লােক নির্ভয়ে নিশংসয়ে অকুণ্ঠিত চিত্তে সমবেত হন। নিজেদের আশা-প্রত্যাশা-সাধ-আহ্লাদের ঝাপি খুলে দেন এখানে। ব্যথা-বেদনাবঞ্চনা-হতাশার ঝর্ণার ফটক উম্মুক্ত করে দিয়ে সােয়াস্তির নির্মল হাওয়ায় মন-প্রাণ-পরিবেশ হালকা করে নিতে এখানেই ছুটে আসেন। এই পরিবেশটা কাউকে বুঝাবার নয়, শব্দ কিম্বা কথায় ব্যক্ত করার নয়, শুধু নিবিড়-গভীর অনুভবের ।

বাংলাদেশ অঞ্চলে আধ্যাত্মিক সাধক-পুরুষরা অতীতে এসেছেন ইয়েমেন-ইরাক-ইরান-কাশ্মীর প্রভৃতি অঞ্চল থেকে । ইতিহাসের সাক্ষ্য অনুসারে দেখা যায়, বড়পীর হযরত আবদুল কাদের জিলানীর (রঃ) অধঃস্তন বংশধর হযরত আবু শামা লাহােরী (রঃ) ও হযরত দেলােয়ার আলী পাকবাজ (রঃ)-এর মাধ্যমে আধ্যাত্মিক ‘লাল’ বা ক্ষমতা হযরত হযরত গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (কঃ)-এর কাছে হস্তান্তরিত হবার পূর্ব পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত ছিল। বলা যায়, তার সময় থেকেই প্রকৃত বাঙালি ঘরানায় আধ্যাত্মিক সিলসিলার অধিষ্ঠান ও অভিযাত্রা শুরু। বাংলাদেশ ও আশেপাশের অঞ্চলগুলােতে এ দেশীয় আধ্যাত্মিক ব্যক্তিবর্গের আবির্ভাব ও বিকাশ ঘটতে থাকে তাঁর বাগান থেকে। এখানে কেবল বিশুদ্ধ মানবতাবাদী চেতনার চর্চাই হয়না, এখান থেকে উৎসারিত হচ্ছে বর্ণাঢ্য সাহিত্য-সঙ্গীত, যা আমাদের বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে চলেছে।

মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির উর্বর বীজতলা হিসেবে বিকশিত হতে থাকে প্রাকৃতিক নিয়মে । হযরত গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ (কঃ)-এর পৌত্র খাদেমুল ফো হযরত শাহসুফি সৈয়দ দেলাওর হােসাইন মাইজভাণ্ডারীকে সেই ১৯৪৬ সাল থেকে শুরু করে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাংলা ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বলিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে দেখা যায়। ১৯৭০ সালে নির্বাচনের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগের বিজয় সম্পর্কে তাঁর একটি আগাম উক্তি সংবাদপত্রে প্রকশিত হয় এবং তা আওয়ামী লীগের নৌকার পালে’ প্রবল গতিময় বাতাসের যােগান দেয়।

আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ বস্তুতঃপক্ষে আধুনিক ইতিহাসে এমন এক সফল জনযুদ্ধ, যা সর্বস্তরের জনগণের ৯৯.৯৯ শতাংশের সক্রিয় শরীকানা ও সমর্থনপুষ্ট । আমাদের এই মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় এই মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন পতাকা কেবল উত্তোলিতই হয়নি, উপরন্তু এই দরবার মুক্তিযােদ্ধাদের নিরাপদ শেল্টার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ।

এভাবে মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ কেবল আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে নয়, জনগণের পৃষ্ঠপােষক বিশাল সামাজিক শক্তি হিসেবেও আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটা গুরুত্বপূর্ণ আসন করে নিয়েছে।

চট্টগ্রামের সন্তান হিসেবে, মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফরূপী সুবিশাল বটবৃক্ষের ছায়াতলের বাসিন্দা হিসেবে এসব তথ্য ও ইতিহাস আমাদের ভবিষ্যৎ জেনারেশনের জন্যে সুবিন্যস্ত আকারে রেখে যাওয়া আমার নৈতিক ও নাগরিক কর্তব্য বলে মনে করেছি। তাই গভীর আগ্রহভরে এসব আকর্ষণীয় তথ্য সংগ্রহে ব্ৰতী হই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধ একজন বাঙালি হিসেবে।

এই পুস্তকে প্রকাশিত তথ্যাবলী ধারাবাহিকভাবে চট্টগ্রামের বহুল প্রচারিত দৈনিক আজাদীতে ১৫ মার্চ ২০০০ সাল থেকে ১০ মে ২০০০ সালে প্রকাশিত হয় । অগণিত পাঠক এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান। দৈনিক আজাদীর তৎকালীন সম্পাদক, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক ও বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম অধ্যাপক মােহাম্মদ খালেদ (১৯২২২০০৩) এগুলােকে পুস্তক আকারে প্রকাশের পরামর্শ দিয়েছিলেন অনেকবার । আমার বেদনা, তিনি পুস্তক আকারে এ প্রকাশনাটা দেখে যেতে পারলেন না।

আমি ঐতিহাসিক নই। এগুলাে একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে সংগৃহীত তথ্যাবলীর একটা বিন্যস্তরূপ মাত্র । আগামী দিনের আগ্রহী ঐতিহাসিকদের কাজে আসতে পারে এমন কিছু তথ্য ও মাল-মসলা এই পুস্তকের ভাণ্ডারে মওজুদ রইলাে ।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার যে, কেবল মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ নয়, এ দরবারের মহান খলিফাগণের আধ্যাত্মিক দরবারগুলােও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল, যা আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের গৌরবােজ্জ্বল অংশ বটে। এসব তথ্য সংগৃহীত হয়ে বিন্যস্ত হওয়া দরকার। আমাদের অনুসন্ধিৎসু ঐতিহাসিক, গবেষক এবং ঐসব দরবারের উত্তরাধিকারীদেরকে এ ব্যাপারে সাগ্রহে এগিয়ে আসতে হবে । এসব ইতিহাস গ্রন্থবদ্ধ হলে আমাদের আগামী জেনারেশনসমূহ জানতে ও উপলব্ধি করতে পারবে, তারা কোন মহান জাতি ও সংগ্রামী ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী । আমি আশা করি, সংশ্লিষ্ট সকলে এ বিষয়ে উদ্যোগী ও তৎপর হবেন।

বলাকা প্রকাশনের জামাল উদ্দিন ও শরীফা বুলবুল লাকী এসব নিবন্ধকে পুস্তক আকারে প্রকাশ করার দায়িত্ব নিয়ে আমাদের দেশ ও জাতির ইতিহাসের গােলাঘরে কিছু দামী সম্পদ যােগান দেবার কৃতিত্বের অধিকারী হলেন ।

মোঃ মাহবুব উল আলম

এনায়েৎপুর, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম । ২৬ মার্চ ২০০৮ খ্রিস্টাব্দ

৳ 125

About The Author

মােঃ মাহবুব উল আলম

মােঃ মাহবুব উল আলম

মােঃ মাহবুব উল আলম চট্টগ্রামের সাংবাদিক জগতে সৎ, কর্মনিষ্ঠ একজন কর্মীপুরুষের নাম। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি নিরবে নিভৃতে এঁকে গেছেন তার দেখা নানা প্রেক্ষাপটের প্রতিচিত্র। যে চিত্রের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক সত্যকাহন। চিন্তা-ভাবনার অসামান্যতা এবং অভিনবত্বে মনে হয় যেন রহস্যের খনি থেকে উঠে এসেছে একজন প্রাকৃতজন। মােটকথা তাঁর অভিজ্ঞতা আর মেধার মিশ্রণে যে গ্রন্থনা তাতে পাঠকের সামনে খুলে যাবে চেনা- তবু যেন এক অচেনা জানালা। তিনি ১৯৪০ সালে চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী থানার | অন্তর্গত এনায়েতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা
মরহুম আবদুস সােবহান ছিলেন সৎ, ধর্মপ্রাণ, নিঃস্বার্থ | সমাজকর্মী ও শিক্ষানুরাগী হিসেবে স্থানীয়ভাবে সর্বস্তরের | মানুষের শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত। মায়ের নাম কুলসুমা | খাতুন। ১৯৫৯ সালে চট্টগ্রাম সরকারি বাণিজ্য কলেজ থেকে বি.কম পাশ করার পর কিছুদিন শিক্ষকতা এবং অধুনালুপ্ত চিটাগং চেম্বার অব কমার্স এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫৫ সালে কলেজ জীবনে প্রবেশ করে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদ-উপনিবেশবাদসামন্তবাদ বিরােধী প্রগতিশীল রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৬৮ সালে আয়ুব-মােনেম। বিরােধী আন্দোলনকালে চাকুরীচ্যুত হন। ১৯৬৯ সালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানকালে ‘নিরস্ত্র সৈনিক' ছদ্মনামে ‘ছন্দের নাম বুলেট' নামে এ গ্রন্থটি প্রকাশ করেন, যা তঙ্কালীন সরকারি রােষানলে পড়ে তাকে বিবিধ হয়রানির শিকার হতে হয়।
১৯৭০ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি কিছুদিন শিক্ষকতা করেন এবং তাঁর শিক্ষক অধ্যাপক। মােহাম্মদ খালেদ সম্পাদিত দৈনিক আজাদী পত্রিকায় সহ-সম্পাদক হিসেবে যােগদানের মধ্য দিয়ে জড়িয়ে পড়েন সাংবাদিকতায়। কৈশাের থেকে মাহবুব উল আলম এর গল্প, কবিতা, নাটক লেখায় হাত যশ ছিল এবং জীবনের নানা। প্রতিকূলতার মধ্যেও এ অঙ্গন থেকে তিনি সরে যান নি। বরং আরও হয়ে উঠেছেন আত্মপ্রত্যয়ী প্রবল এবং বিস্তৃত। চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সমাজ’-এ ধারাবাহিক গল্প ‘ভূতের বাতি’ প্রকাশনার মধ্য দিয়ে সাহিত্য জগতে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে। এরপর ম. আলম, ম, আলম চৌধুরী নামে বিভিন্ন। পত্রিকায় বিভিন্ন বিষয়ে লিখে যেতে থাকেন। '৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রগতিশীল রাজনীতির সক্রিয় কর্মী হিসেবে ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৬ সালে মওলানা ভাসানী প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘হক কথা’র বার্তা সম্পাদক হিসেবে ঐ পত্রিকার সম্পাদনার সাথে জড়িত হন। এবং মওলানা ভাসানীর মৃত্যুর পর পুনরায় চট্টগ্রামে ফিরে এসে দৈনিক আজাদীতে যােগ দেন। ইতােপূর্বে ১৯৭২ সালে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত বামপন্থী ‘সাপ্তাহিক লাল পতাকা’র প্রকাশনা ও সম্পাদনার সাথে ওতপ্রােতভাবে জড়িত ছিলেন। পরবর্তীকালে অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক ইশতেহার', সাপ্তাহিক খতিয়ান’ ও ‘মাসিক আলােকধারার সম্পাদনার সাথে জড়িত হন। মােঃ মাহবুব উল আলম ১৯৮০ সাল ও ১৯৮১ সালে পর পর দু’বার চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন। তাঁর প্রকাশিত অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘আদর্শের চেয়ে মানুষ বড়’, ‘ঐশী আলাের জলসাঘর’ এবং সম্পাদিত গ্রন্থাবলীর মধ্যে রয়েছে ‘মওলানা ভাসানী’, ‘ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব ও শাহানশাহ্ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক), হযরত শাহজাহান শাহ (র), ‘স্বাধীনতার কাছে স্মারকলিপি।। প্রকাশনার অপেক্ষায় রয়েছে, স্বাধীনতার চাষী', ফাগুনের পদাবলী’ (মহান একুশের কবিতা সংকলন) ও একাধিক প্রবন্ধ সংকলন।

Reviews

There are no reviews yet.

Be the first to review “বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধে মাইজভান্ডার দরবার শরীফ/BANGLADESHER SHAWADHINATA SANGRAM O MUKTIJUDDHE MAIZBHANDAR DDARBAR SHARIF”

Your email address will not be published. Required fields are marked *