বন্দি নারী

মেয়েটি এক্কেবারে ছোট্ট। নাম মুনমুন। কয়েকজন মানুষকে একসাথে দেখলে বিব্রতবোধ করে। কোনোদিকে আর ফিরেও তাকায় না। নীচের দিকে চেয়ে চেয়ে দূরে চলে যায়। একদিন আমি আমাদের বাসা সংলগ্ন পুকুর পাড়ে বসে আছি। সেই পুকুরের পাশ দিয়ে একটা মেঠোপথ। সে পথ দিয়ে গাঁয়ের লোকজন চলাচল করে। সকালবেলা নানান পেশার লোক এই পথ দিয়ে আসে যায়। জেলেরা, দুধওয়ালা, ফেরিওয়ালা, শাক্ সব্জি নিয়ে সব ব্যবসায়ী দৌঁড়ায়। মফস্বল শহরের বাজার টাটকা জিনিষে সয়লাব। স্কুলের ছেলেমেয়েরাও এই পথে চলাচল করে। একদিন আমি দেখি একটি মেয়ে মলিন মুখ ও কান্না কান্নাভাব নিয়ে বই হাতে স্কুলে যাচ্ছে। কয়েকদিন দেখি একইভাবে যাচ্ছে। একদিন গিয়ে মেয়েটির সামনে দাঁড়াই। আমাকে দেখে মেয়েটি দাঁড়িয়ে যায়। তখন আমি জিজ্ঞেস করি, “এই মেয়ে তোর নাম কী?”

কোন জবাব নেই।

এইভাবে বার বার জিজ্ঞেস করেও জবাব না পেয়ে মেয়েটির গাঁয়ে হাত বুলাতে থাকি। দেখি, মেয়েটির চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে। মেয়েটির চোখের জল দেখে আমি স্থির থাকতে পারিনা, মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে আবার জিজ্ঞেস করি, কোথায় যাচ্ছিস? এইবার জবাব পাই। জবাবে বলে, “স্কুলে যাচ্ছি”।

৳ 150

About The Author

রিজিয়া বেগম

রিজিয়া বেগম

প্রায়  একযুগ ধরে শিল্পের জগতে রিজিয়া বেগমের বিচরণ। কবিতা, গল্পের পর এটাই তাঁর প্রথম উপন্যাস।

তাঁর জন্ম ১৯৪৩ সালের ১ জুলাই , সন্ধীপ উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের এক স্মব্রান্ত পরিবারে। বাল্য ও কৈশোর কেটেছে এক সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে। তাঁর পিতা এ কে এম মমিনুল হক ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব। পিতার পদাঙ্ক অনুসরন করে রিজিয়া বেগম বেছে নিলেন শিক্ষক্তার মহান পেশা।

বলাকা প্রকাশনঃ

মেয়েটি এক্কেবারে ছোট্ট। নাম মুনমুন। কয়েকজন মানুষকে একসাথে দেখলে বিব্রতবোধ করে। কোনোদিকে আর ফিরেও তাকায় না। নীচের দিকে চেয়ে চেয়ে দূরে চলে যায়। একদিন আমি আমাদের বাসা সংলগ্ন পুকুর পাড়ে বসে আছি। সেই পুকুরের পাশ দিয়ে একটা মেঠোপথ। সে পথ দিয়ে গাঁয়ের লোকজন চলাচল করে। সকালবেলা নানান পেশার লোক এই পথ দিয়ে আসে যায়। জেলেরা, দুধওয়ালা, ফেরিওয়ালা, শাক্ সব্জি নিয়ে সব ব্যবসায়ী দৌঁড়ায়। মফস্বল শহরের বাজার টাটকা জিনিষে সয়লাব। স্কুলের ছেলেমেয়েরাও এই পথে চলাচল করে। একদিন আমি দেখি একটি মেয়ে মলিন মুখ ও কান্না কান্নাভাব নিয়ে বই হাতে স্কুলে যাচ্ছে। কয়েকদিন দেখি একইভাবে যাচ্ছে। একদিন গিয়ে মেয়েটির সামনে দাঁড়াই। আমাকে দেখে মেয়েটি দাঁড়িয়ে যায়। তখন আমি জিজ্ঞেস করি, “এই মেয়ে তোর নাম কী?”

কোন জবাব নেই।

এইভাবে বার বার জিজ্ঞেস করেও জবাব না পেয়ে মেয়েটির গাঁয়ে হাত বুলাতে থাকি। দেখি, মেয়েটির চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে। মেয়েটির চোখের জল দেখে আমি স্থির থাকতে পারিনা, মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে আবার জিজ্ঞেস করি, কোথায় যাচ্ছিস? এইবার জবাব পাই। জবাবে বলে, “স্কুলে যাচ্ছি”।

নাম কী?

‘মুনমুন’।

বাড়ী কোথায়?

শিমূল তলায়।

Ñ কোনদিকে শিমুল তলা।

Ñ এখান থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে।

বাবা আছেন?

বাবা আছেন। মা ভাই-বোন সবাই আছেন। তবে সৎ মা।

আস্তে আস্তে মেয়েটির মুখ দিয়ে নানান কথা ফুটে। আপন মনে বির বির করে বলে, আমরা ভাইবোন তিনজন। আমার বাবা দুই বিয়ে করেছে। আমার সৎ মা বড়, আমার মা ছোট। কয়েকবছর আগে মাকে তালাক দেয়।

আমি জিজ্ঞেস করে, তোমার মা তোমাকে নেয়নি?

কোথায় নিয়ে যাবে। মায়ের থাকার জায়গা নেই।

কেন? মায়ের থাকার জায়গা নেই। সবার মুখে শুনেছি, মা পাঠ্যাবস্থায় গোপনে বাবাকে ভালবেসে বিয়ে করেছিল। নানা তাই মাকে বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। নানার বাড়ীতে সবাই লেখাপড়া করে। বিয়ে করার পরই মায়ের গর্ভে আমার জন্ম। কোথাও মাথা গুজিবার জায়গা মেলে না। অনেক ঘুরাঘুরি করে অবশেষে মাকে বাবার বাড়ী নিয়ে আসেন। বাড়ীতে আসার পর মায়ের মানসিক পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। শুরু হয় রৌদ্র-মেঘের লুকোচুরি খেলা। আমার মায়ের গর্ভধারন সৎমা সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। আমার মা কত পরিশ্রম করেছে। সংসারের নিত্যদিনের কাজকর্ম, সন্তান প্রসব, সন্তান লালন-পালন কিছুই থেমে নেই। কিন্তু বাবা ও বড় মায়ের সঙ্গে বড় মায়ের কথা শুনে আমার মায়ের উপর সবরকম অত্যাচার চালিয়ে শান্ত হয়নি। শেষ অবধি মাকে তালাক দিয়ে বিদায় করেছে। আমার একটু একটু বুদ্ধি হওয়ার পর মা আমাকে নিয়ে শুরু করেছে নানান তালবাহানা। আমাকে দিয়ে ঘরের সব কাজ করায়। স্কুলে যাওয়ার জন্য বাবা বই কিনে দিয়েছে। মা আমাকে বই ধরতে নিষেধ করেছে। আমি বই নিয়ে পড়তে দেখেছে তাই মা বইগুলো লুকিয়ে রেখেছে। কাজকর্ম সেরে আমি অনেক খোঁজাখুঁজি করে বইগুলো নাগালে পায়নি। একদিন স্টোর রুমে পরিষ্কার করতে গিয়ে দেখি বইগুলো পড়ে আছে। জীবনের সব আশা আকাংখা বিসর্জন দিয়ে মা কোথায় চলে গেল। আমাকে রেখে গেল বিষবৃক্ষের নীচে। আমি মায়ের সব অত্যাচার সহ্য করি। প্রতিবাদ করিনি কখন। কাজকর্ম সব সেরে বাবার দেওয়া বইগুলো খানিকক্ষণ বসে নিজে নিজে পড়তে লিখতে চেষ্টা করি। আমার বড় ভাইবোনদের ইচ্ছে আমিও লেখাপড়া করি। গোপনে আমাকে বই নিয়ে বসিয়ে দেয়, খাতা কলম নিয়ে লিখতে দেয়। আমি ও তাদের কাছ থেকে পড়তে লিখতে শিখি। মাকে কত অনুরোধ করেছি আমাকে তাদের সঙ্গে স্কুলে নেওয়ার জন্য। মা রাজী হয়নি। কত কান্নাকাটি করেছে। মায়ের আদেশ আমাকে স্কুলে যেতে দেবে না। তাই কাজকর্ম শেষ করে না খেয়ে স্কুলে যাই। দেরী হয়ে যায়। কিন্তু উপোস। স্কুলে গেলে উপোস থাকতে হবে, মা বলে দিয়েছে।

ছোট্ট মেয়েটির কথা শোনে মনে বড়ই আঘাত লেগেছে। মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলছি, যাও আজকে অনেক বেশী দেরী হয়ে গেছে। স্কুলের মাস্টার বকাবকি করবেন। মুনমুন চলে গেলে কতক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে চেয়েছি আমি নিজেও জানিনা। বাসায় ফিরে এসে ছোট্ট মেয়েটির কথাগুলো নানান ভাবনায় মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। মায়ের বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ সহজভাবে মেনে নেওয়া যায় না। তবুও ছোট্ট মেয়েটির মাঝে উচ্চাকাংখা আছে, তা তার কথাবার্তায় বুঝা যায়। মেয়েটি একদিন তার লালিত

Reviews

There are no reviews yet.

Be the first to review “বন্দি নারী”

Your email address will not be published. Required fields are marked *