চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় লিখিত পূর্ণাঙ্গ কোনো সাহিত্যকর্ম না থাকলেও মধ্যযুগের চট্টগ্রামী কবিদের রচিত সাহিত্যকর্মে বেশ কিছু চট্টগ্রামী শব্দ স্থান পেয়েছে। চট্টগ্রামী এমন বহু শব্দ আছে যেগুলো এতো প্রাণবন্ত ও অর্থবহ যে, এগুলো ব্যবহার না করতে পারলে চট্টগ্রামবাসীর মন ভরে না।

চট্টগ্রামের লোকের মুখে আজকাল আর চট্টগ্রামের ভাষার সেই আবহ তেমন পাওয়া যায় না। অনেকেই আজকাল চট্টগ্রামী ক্রিয়াপদ দিয়ে কলকাতা কিংবা ঢাকার ভাষায় কথা বলে। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে এমন দিন আসবে যখন চট্টগ্রামী বাংলা বা ভাষা একেবারে হারিয়ে যাবে। এমনকি চট্টগ্রাম অঞ্চলেও এই ভাষা আর থাকবে বলে মনে হয় না।

এভাবে কোনো কোনো জনগোষ্ঠীর ভাষা চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে।

পৃথিবীর সকল ভাষাতেই যেটিকে আদর্শ তথা সাহিত্যিক ভাষা বলে গণ্য করা হয়, তাও গড়ে ওঠেছে কোনো এক বিশেষ অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষার উপর ভিত্তি করে। বাঙালিরা যে ভাষাটিকে বর্তমানে আদর্শ ভাষা বলে গণ্য করে, সেটি গড়ে উঠেছে কলকাতা এবং তৎপার্শ্ববর্তী এলাকার মুখের ভাষার উপর ভিত্তি করে। তাই চট্টগ্রামের ভাষার একটি আঞ্চলিক অভিধান সংকলনের মাধ্যমে বিলুপ্তপ্রায় এই ভাষাটির সংরক্ষণ বিষয়ে সম্পাদকের চিন্তা একটি মহৎ ও যুগোপযোগীও বটে।

পেশাগত ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে এই দুরূহ অথচ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কাজটি সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করে নুর মোহাম্মদ রফিক চট্টগ্রামবাসীর কাছে ধন্যবাদার্হ হয়েছেন।

বিশিষ্ট ভাষাবিদ শ্রদ্ধেয় প্রফেসর মোহাম্মদ আলীর উৎসাহ-পরামর্শ এবং ভূমিকা রচনা এ অভিধানকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। তাঁদের উভয়কে কৃতজ্ঞতা জানাই।

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান নামক এ গ্রন্থটি চট্টগ্রামের উপভাষা চর্চার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ও তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে। চট্টগ্রামের সাহিত্যামোদীদের কাছে বইটি অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার হয়ে থাকবে বলে আমি মনে করি।

 

৳ 350

About The Author

নূর মোহাম্মদ রফিক

বলাকা প্রকাশনঃ

বাংলাদেশের যে কটি উপভাষা (dialect) নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যে প্রচলিত রয়েছে তাদের তিনটিকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা যায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের আঞ্চলিক ভাষা।

মূলভাষা বাংলার সঙ্গে মৌলিক সাযুয্য স্বীকার করেও বলা যেতে পারে standard বাংলার সঙ্গে চট্টগ্রামী উপভাষার যেসব পার্থক্য চোখে পড়ে সেগুলি মূলতঃ phonetic, syntactic ও  morphlogical.

বলা বাহুল্য, ভাষার মত উপভাষাও socio-cultural বা নিয়মনির্ভর যা বিশ্লেষণের মাধ্যমে বর্ণনাযোগ্য। সম্পাদকের নিজের কথায় তাঁর উদ্দেশ্যের বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায়। তাঁর প্রথম প্রেরণা ভাষাতাত্ত্বিক নয়, তা প্রধানত সমাজ ও সংস্কৃতিমূলক বা  Received standard। চট্টগ্রামের উপভাষায় প্রচলিত অনেক শব্দ ক্রমশ নানা কারণে অবলুপ্ত হতে চলেছে। প্রধানত সেই প্রবণতাকে চিহ্নিত করে বিস্মৃতির অপঘাত থেকে এই শব্দ ভাণ্ডারকে সুরক্ষা করার লক্ষ্যেই তাঁর শ্রম ও প্রয়াস নিবেদিত।

উপভাষা ক্রমে বিবর্তিত হয়ে প্রমিতরূপ বা জবপবরাবফ ঝঃধহফধৎফ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়; সব উপভাষা যদিও প্রমিতরূপ লাভ করতে পারে না। ভাষার প্রমিতিকরণে মূলতঃ নগরের প্রভাবই সবচেয়ে শক্তিশালী। এরপর ভাষার সম্পদ ও শক্তি বৃদ্ধিতে কবি-সাহিত্যিক ও লেখকদের অবদান। ইংরেজি, বাংলাসহ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষাগুলি সম্পর্কেই এ সত্য। ভাষার শক্তি, সজীবতা, প্রকাশক্ষমতা- এক কথায় এর প্রাণ নির্ভর করে এর কথ্য প্রচলনে। বিশেষ করে সমাজের শিক্ষিত অংশের নিত্যকার ব্যবহারে।

দুর্ভাগ্যবশত চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা ক্রমশ চট্টগ্রামের বিদ্বজ্জন সম্প্রদায় থেকে নির্বাসনের পথে। বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের সঙ্গে এর দূরত্ব যে হারে বেড়ে চলেছে তাতে ভয় হয়, হয়তোবা এমন দিন বেশি দূরে নয় যখন তা বোধগম্যতারও সীমা অতিক্রম করবে। এই সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রবণতার কিছু ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে। যেমন : সাম্প্রতিককালে electronic mediaবিশেষ করে টেলিভিশনের কল্যাণে চট্টগ্রাম অঞ্চলের কিশোর-কিশোরীদের প্রমিত উচ্চারণের ক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় উন্নতি হয়েছে এবং হচ্ছে। এ না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের পিছিয়ে পড়ার এবং মূল ছাত্রগোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন বা isolated হয়ে  পড়বার সম্ভাবনা থাকবে, যার পরিণতিতে পরবর্তীকালে তাদের পেশাগত ও কর্মজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে discrination এর শিকার হবার আশঙ্কা থাকবে। ফলে একই পরিবারে প্রায় দেখা যায় ছেলেমেয়েরা নিজেদের মধ্যে এবং বাবা-মার সঙ্গে শুদ্ধ উচ্চারণে ভাল বাংলা বলছে, অন্যদিকে বাবা-মা নিজেদের মধ্যে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছেন। এ চিত্র চট্টগ্রামের প্রায় ঘরে ঘরে।

সুলতানী, মোগল ও বৃটিশ আমলের অনেক আগে সপ্তম শতাব্দী থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে আরব বণিকেরা ব্যবসা উপলক্ষে আসা শুরু করে। এর পরে ইউরোপ থেকেও বাণিজ্য সূত্রে জলপথে লোকজন আসতে থাকে। শহর চট্টগ্রামে দীর্ঘকাল ধরে তাদের বসবাসের ফলে বিশেষ করে আরব ব্যবসায়ী ও তাদের সঙ্গে আগত লোকজনের দীর্ঘ অবস্থানের ফলে চট্টগ্রাম শহর তথা বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে আরবী, ফার্সি, তুর্কি ইত্যাদি ভাষার ব্যাপক প্রভাব পড়ে; এবং এসব ভাষা থেকে আগত শব্দাবলীর অপভ্রংশ রূপ চট্টগ্রামের উপভাষায় ব্যাপকভাবে স্থান পায় এবং সাধারণ মানুষের কথ্য ভাষার অংশ হয়ে আজো প্রচলিত রয়েছে।

সুখের বিষয়, সাম্প্রতিককালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত বাংলা ভাষার বহু অভিধানে Perso-Arabic loan words যা বর্তমান বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর

ঝঃধহফধৎফ ভাষায় প্রচলিত  রয়েছে, এসব শব্দের অন্তর্ভুক্তি লক্ষ্য করা যায়। ভাষা চর্চা তথা অভিধান সংকলনের ক্ষেত্রে এটি একটি অভিনন্দনযোগ্য সঠিক পদক্ষেপ। এই Perso-Arabic শব্দগোষ্ঠীর অনেক শব্দ এমন পরিবর্তিত রূপে চট্টগ্রামী ভাষায় প্রচলিত রয়েছে যা সহজে চেনা যায় না। এমন বহু শব্দ বর্তমান অভিধানে সংকলিত হয়েছে।

আমি আগেই বলেছি মূল ভাষার সঙ্গে চট্টগ্রামী উপভাষার প্রধানতম পার্থক্য উচ্চারণগত এবং শব্দ ও শব্দরূপজাত। এ পার্থক্যগুলি শুধুমাত্র ছাপার অক্ষরের মাধ্যমে বিশদ করা খুবই কঠিন। তার জন্য প্রয়োজন International phonetic Alphabet বা IPA-এর ব্যবহার। বর্তমান অভিধানে ওচঅ-এর সাহায্য নেয়া হলে নিঃসন্দেহে এর মূল্যবৃদ্ধি পেত। এই সীমাবদ্ধতা শুধু বর্তমান অভিধানের নয়, বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রায় কোন অভিধানেই IPA ব্যবহৃত হয় না।

ড. শহীদুল্লাহ্ সম্পাদিত বাংলা ভাষার আঞ্চলিক অভিধানটিতে চট্টগ্রামী বাংলার যে বিবরণ তিনি দিয়েছেন তা অবশ্যই একটি প্রশংসনীয় ও স্মরণীয় কাজ। কেননা তাঁর আগে চট্টগ্রামী উপভাষার কোন আভিধানিক উপস্থাপনা আমাদের নজরে পড়ে না। কিন্তু চট্টগ্রাম উপভাষা যাঁদের মুখের ভাষা অর্থাৎ যাঁরা এ ভাষায় অভ্যস্ত তাঁরা সহজেই ড. শহীদুল্লাহ্কৃত আঞ্চলিক অভিধানের চট্টগ্রাম অংশের কিছু সীমাবদ্ধতা বা Inaccuracy বুঝতে পারেন। এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং একথা যখন বলি তখন কেউ যেন মনে না করেন আমরা এই ভাষাবিজ্ঞানীর কাজকে অবমূল্যায়নের চেষ্টা করছি। বাংলা উপভাষা চর্চার ক্ষেত্রে তিনি অগ্রপথিক; তাঁর কৃতিত্ব অনস্বীকার্য।

চট্টগ্রামের উপভাষা একটি বিশাল অঞ্চল জুড়ে প্রচলিত। শহর চট্টগ্রাম, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা, মধ্য চট্টগ্রামÑ বৃহত্তর চট্টগ্রামকে এ চার ভাগে সাধারণভাবে বিভাজন করলেও উপভাষাটির ধ্বনি, বাগবিধি ও অর্থগত বিপুল বৈচিত্র্যের পূর্ণ বর্ণনা ও পরিচয় তুলে ধরা সহজ কাজ নয়। কোন একটি অভিধানে বোধ করি তা আশা করাও যায় না। তবে, নূর মোহাম্মদ রফিক সীমিতভাবে হলেও আমাদের উপভাষার বিশেষ চারিত্র্য ও বৈচিত্র্যের এই দিকটি তুলে ধরবার আন্তরিক প্রয়াস পেয়েছেন। এ জন্যে তিনি বাংলাদেশের সুধী সমাজের প্রশংসা অর্জন করবেন নিঃশংসয়ে। ভাষা ও সাহিত্যের একজন ছাত্র হিসাবে আমি মনে করি আঞ্চলিক বা উপভাষা যে কোন মুখ্য ভাষার একটি মূল্যবান সম্পদ। এর ঐতিহাসিক, সামাজিক, সাহিত্যিক মূল্যের বি¯তৃত আলোচনার অবকাশ এখানে নেই।

স্কটল্যান্ডের খ্যাতনামা কবি বার্নস্ তাঁর আঞ্চলিক উপভাষায় কাব্য রচনা করে ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। এছাড়া শেক্স্পিয়র তাঁর অনেক নাটকে, ডিকেন্স্ ও হার্ডি তাঁদের উপন্যাসে ইংল্যান্ডের আঞ্চলিক ভাষার সফল ব্যবহার করেছেন।

ইংরেজি যাঁদের মাতৃভাষা তাঁরা তাঁদের উপভাষাগুলি সম্পর্কেও সমান আগ্রহী। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ইংল্যান্ডের সকল ফরধষবপঃ সম্পর্কে বিপুল পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণায়। বাংলা ভাষার অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষার মত, চট্টগ্রামী উপভাষারও একটি নিজস্ব মেজাজ ও ব্যঞ্জনা রয়েছে যা একান্তই তার নিজস্ব। কোন উপভাষাকেই বিলুপ্ত হতে দেওয়া যায় নাÑ কেননা মূলভাষার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ উপভাষা।

চট্টগ্রামী উপভাষাসহ বাংলার সকল উপভাষা সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন ভাষা বিজ্ঞানীদের আগ্রহ। প্রয়োজন নিষ্ঠ গবেষণার মাধ্যমে প্রতিটি উপভাষার অন্তর্নিহিত গঠনশৈলীর সূত্রগুলিকে চিহ্নিতকরণ এবং উপভাষার সকল শাখাকে যথাসম্ভব International phonetic Alphabet বা IPA দ্বারা লিপিবদ্ধ করা।

বর্তমান অভিধানটি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা তথা বাংলাভাষার সকল উপভাষা চর্চায় নিয়োজিত ভাষাপ্রেমী গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করুক এবং তাঁদের প্রজ্ঞা ও পাণ্ডিত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার বর্ণনা ও বিশ্লেষণে প্রাণিত হোকÑএ আমার একান্ত প্রত্যাশা।

এ/২০, চান্দগাঁও আ/এ, চট্টগ্রাম

মোহাম্মদ আলী
সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Reviews

There are no reviews yet.

Be the first to review “চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান”

Your email address will not be published. Required fields are marked *