গাধা কাহিনি/GADHA KAHINI

চাণক্য একজন ধীমান ক‚টনীতিবিদ ছিলেন। মৌর্য সাম্রাজ্য সুপ্রতিষ্ঠিত করবার পেছনে তার অসামান্য অবদান রয়েছে। রাজনীতিতে ‘চাণক্য নীতি’ নামে একটি প্রবাদসম কথা চালু রয়েছে। তিনি রাজনীতিবিদদের গাধার কাছে থেকে ধৈর্যগুণ গ্রহণ করতে বলেছেন। আসলে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর প্রয়োজন রয়েছে। গাধার এই অনন্য সাধারণ গুণটি থাকা সত্তে¡ও গাধা কথাটি তুচ্ছার্থে কেন ব্যবহার করা হয় তা আমার মাথায় ঢুকেনা। শৈশবে বাবা আমাকে পড়াতে বসালে কখনো ধৈর্য ধারণ করতে পারতেন না। তিনি রাগ ঝাড়তেন আমাকে গাধা ডেকে। একবার তিনি এতই রেগে গিয়েছিলেন যে দিশেহারা হয়ে তিনি আমাকে ‘গাধার বাচ্চা কোত্থাকার’ ডেকে ফেলেছিলেন। আমি জানতাম মানুষ কুত্তার বাচ্চা, শুয়োরের বাচ্চা বলে গালি দেয়। কিন্তু গাধার বাচ্চা গালিটি প্রথম আমি বাবার মুখে শুনেছিলাম। আমার খুব মনে পড়ে বিয়ের পর নতুন বউ এর সাথে আমি কথা বলতে বিব্রতবোধ করছিলাম বলে বাবা আমাকে বলেছিলেন, তুই এখনো গাধা রয়ে গেলি। ছেলেবেলায় বাবার কাছ হতে আমি গাধা কথাটি এতই শুনেছি যে এটা আমার গা সওয়া হয়ে গিয়েছিলো। বড় হয়ে যাওয়ার পর তিনি অবশ্য আমাকে খুব কমই গাধা ডাকতেন। কিন্তু এতে আমি স্বস্তি পেতাম না। বাবা গাধা ডাকলে আমার রাত্রে ভালো ঘুম হতো। গাধারও নিশ্চয়ই এমন হয়। আমি মেধাহীন ছিলাম বলে বাবা আমাকে গাধা ডাকার যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছিলেন। আমি সে সুযোগ পাইনি, কারণ আমার ছেলে যথেষ্ট মেধাবী ছিলো। ছেলেকে গাথা ডাকতে না পারার দুঃখ আমার এখনো রয়ে গেছে। আমি গাধা চরিত্রের মানুষ হলেও ধৈর্যশীল নই। ছেলেবেলায় আমি রেগে গেলে লাফালাফি করতাম। মা বলতেন, তুই ‘চিরুং মাছ’ এর মতো লাফাচ্ছিস কেন? ছেলেবেলায় আমার গাধা প্রাণীটি দেখবার খুব কৌত‚হল ছিলো। গাধা দেখেছি বড় হয়ে। দেখেছি ছেলেকে নিয়ে যথন ঢাকায় চিড়িয়াখানায় গিয়েছিলাম। প্রবল উৎসাহে তাকে বলেছিলাম, ঐ দেখ্ গাধা। একটি মহাজন বাক্য রয়েছে, গাধা পেটালে ঘোড়া হয়না। আমার ধারণা ঘোড়া পেটালে সে ঘোড়া গাধা হয়ে যাবে। শুনেছি সেকালে ধোপারা গাধাকে কাপড় বয়ে নিয়ে যাবার জন্যে কাজে লাগাতো। এতে বোঝা যায়- এ দেশে এক সময় গাধা ছিলো। এখন সে গাধা হারিয়ে গেলেও আমার মতো অনেক গাধা রয়েছে। আমরা বলি ‘গোবেচারা’। আমার কিন্তু গরুর চাইতে গাধাকেই বেশি বেচারা বলে মনে হয়। এ জন্যে ‘গোবেচারা’ না বলে বরং ‘গাবেচারা’ বলাই শ্রেয়। গরু রেগে গেলে শিং উঁচিয়ে তেড়ে আসে। গাধা কখনো রাগ করেনা। তাছাড়া গুঁতো দেওয়ার মতো গাধার শিংও নেই। পুরুষ গরুকে আমরা ষাঁড় বলে থাকি। মহিলাকে বলি গাই। আমি জানিনা গাধার ক্ষেত্রে কি বলা হয়। গরুকে আবার বলদও করা হয়। গাধাকেও নিশ্চয়ই করা যাবে। কিন্তু গাধার বেলায় তখন গাধাকে কি বলা হবে সেটা আমার জানা নেই। বাংলা ভাষায় ‘গাধার টুপি’ বলে একটি কথা প্রচলিত রয়েছে। সার্কাসের ‘ক্লাউন’দের আমি গাধার টুপি পরে মানুষ হাসাতেও দেখেছি। আমার খুব ইচ্ছে করে গাধির দুধ খেতে। আমি মনে করি এ দুধ খুব পুষ্টি সমৃদ্ধ। আমি জানিনা এ দেশে কেও গাধার খামার করছে কিনা। করলে ভালো হতো। দার্শনিকরা বলে থাকেন, ‘নো দাই সেলফ’ অর্থাৎ নিজেকে জানো বা আবিষ্কার করো। আবিষ্কার করলাম, আমি সত্যিই একজন খাঁটি গাধা।

৳ 150

About The Author

সত্যব্রত বড়ুয়া

সত্যব্রত বড়ুয়া

সত্যব্রত বড়ুয়া এক আলোকিত পরিবারের সন্তান। ১৯৪২ সালে (সার্টিফিকেট ১৯৪৪) বাবার চাকুরীস্তল পাবনায় জন্ম। বাড়ী চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার মহামুনি পাহাড়তলী গ্রামে। শিক্ষা –দীক্ষায় উন্নত হওয়ার কারনে ব্রিটিশ আমলেই এ গ্রামটি ব্যাপক ভাবে পরিচিতি লাভ করেছিল। বাবা জ্যোতির্ময় বড়ুয়া দু’জনেই প্রাগ্রসর চিন্তার মানুষ ছিলেন। সত্যব্রত’র লেখক হওয়ার ইচ্ছে ছেলেবেলা থেকেই ছিল। বাবা-মা ও তাই চাইতেন। তাঁরা লেখক হওয়ার জন্যে ছেলেকে সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন। কিশোর ও তরুণ বয়সে প্রচুর কবিতা লিখেছেন সত্যবত। তাঁর কিছু কবিতা একসময় জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। চাকুরী জীবনে তিনি লেখালেখির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পারলেও তাঁর সাহিত্য চর্চা অবহ্যাত ছিল। সত্যব্রত বড়ুয়া বই প্রেমিক। দুষ্প্রাপ্য বই সংগ্রহের প্রতি তাঁর দুনির্বার আকর্ষন রয়েছে। অবসর জীবনে আবার লিখতে শুরু করেছেন। সত্যব্রত’র প্রথম বই ‘বাঁকা চোখে’ ২০০৩ সালে প্রকাশিত হয়। বইটই সুধিজনের দৃস্টি আকর্ষন করে। পরবর্তিতে ‘যদি সুন্দর একখানা মামা পাইতাম’ (২০০৯) এবং ‘রম্য সম্ভার’(২০১৩) নামের দু’টি রম্যবই প্রকাশিত হয়েছে। পাঠকদের কাছে সবাদৃত হয়েছে বইগুলো। তিনি ‘দৈনিক আজাদী’ পত্রিকায় রম্য রচনা লিখে থাকেন। এরই মধ্য বিভিন্ন সংগঠন তাকে লেখালেখির জন্য সন্মাননা প্রদান করেছে।

Reviews

There are no reviews yet.

Be the first to review “গাধা কাহিনি/GADHA KAHINI”

Your email address will not be published. Required fields are marked *