কালুরঘাট প্রতিরোধ যুদ্ধ ও অন্যান্য/KALURGHAT PROTIRODE JUDDHO O ONYANYO

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত ৮.৪৫-৯.০০ টার মধ্যে হালিশহর ইপিআর সদর দপ্তরের অ্যাডজুটেন্ট ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম ইপিআর সৈনিকদের নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহ করতে অনেক বিলম্ব হয়। এই রেজিমেন্টের হেড কোয়ার্টার ছিল ষোলশহরে। রাত ৩.০০ টার প্রাক্কালে মেজর জিয়া এই রেজিমেন্টের  কমান্ডিং অফিসারের দায়িত্ব নিয়ে একটি ৪৫ গ্যালনের ড্রামের উপর দাঁড়িয়ে বিদ্রোহের ঘোষণা দিয়ে সৈনিকদের কালুরঘাটের দিকে রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ দেন। রাত ৩.০০ টায় রওয়ানা হওয়ার সময় ইবিআরসি থেকে পালাতে সক্ষম হওয়া সৈনিকদের অনেকে তাদের সাথে যুক্ত হয়।  এখানে উল্লেখ্য, তারা রওয়ানা হওয়ার সময় রাস্তায় ব্যারিকেড সরানো ওসোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস করার কাজে নিযুক্ত সৈনিকরা তখনও ফিরে না-আসায় হেড কোয়ার্টারে নায়েব সুবেদার আবদুল মালিকের নেতৃত্বে একটি ছোট সেনাদল তাদের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য রাখা হয়।  সৈনিকরা ফিরে এলে কী করবে সেই নির্দেশনাও সুবেদার আবদুল মালিককে দেয়া হয়।

অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট পথিমধ্যে কালুরঘাটে ইপিআর-এর ক্যাপ্টেন হারুন আহমদে চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন কোম্পানির সাক্ষাৎ পায়। তারা চট্টগ্রাম শহরে ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলামের সাথে যোগ দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু মেজর জিয়ার নির্দেশে ক্যাপ্টেন হারুন চৌধুরী তাঁর কোম্পানি নিয়ে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাথে থাকতে বাধ্য হন। এরপর, এই রেজিমেন্ট ও কোম্পনি বোয়ালখালীর করলডেঙা পাহাড়ে পৌঁছে। এভাবে শুরু হয় কালুরঘাট প্রতিরোধ যুদ্ধ। এই প্রতিরোধ যুদ্ধ ১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল পর্যন্ত চলে।  সেদিন পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে কালুরঘাটের পতন ঘটে।

বলা বাহুল্য, ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর বাসভবনে গৃহীত মেসেজ অনুসারে চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এম. এ হান্নান ২৬ মার্চ দুপুর ২.১০ টায় কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বকণ্ঠে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা দেন। এরপর সন্ধ্যা ৭.৩০ টায় রেডিও ইঞ্জিনিয়ার মোসলেম খঅন সম্পূর্ণ নিজ দায়িত্বে ১০ কিলোওয়াট বিশিষ্ট ট্রান্সমিটারটি চালু করলে শুরু হয় দ্বিতীয় অধিবেশন।  এম. এ হান্নান এই অধিবেশনেও বঙ্গবন্ধুর পক্ষে দ্বিতীয়বারের মতো স্বাধীনতা ঘোষণা প্রদান করেন।

২৭ মার্চ সন্ধ্যা ৭.৩০ টায় শুরু হওয়া অধিবেশনে ৭.৪০ টায় মেজর জিয়া বঙ্গবন্ধুর পক্ষে একটি ঘোষণা পাঠ করেন।  তিনি সেদিন রাত প্রায় ৯.৩০ টায় কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে পুনরায় এসে নিজেকে `Provisional Head of the Swadhin Bangla Liberation Fovernment’  ঘোষণা করে আরেকটি ভাষণ প্রদান করলে আওয়ামী নেতৃবৃন্দ ও রাজনীতি সচেতন জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যহীন এ ঘোষণা শুনে মনে হচ্ছিল, দেশে যা চলছে তা মুক্তিযুদ্ধ নয়, বরং সামরিক অভুত্থান।

২৮ মার্চ একাধিকবার, মেজর জিয়ার নিজেকে `Provisional Head’ ঘোষণা করে প্রদত্ত ভাষণটি কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্র্রচার করা হয়। ৩০ মার্চ সকালের অধিবেশনে মেজর জিয়াকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা অর্থ্যাৎ এ কে খান কর্তৃক তৈরিকৃত ঘোষণা পাঠ করতে শোনা যায়।  তিনি `Provisional Commander-in-Chief of the Bangladesh Libeation Army’  যুক্ত করে ঘোষণাটি পাঠ করেন।

৩০ মার্চ সকাল ও দুপুরের অধিবেশন সমাপ্ত হওয়ার পর কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র পাকিস্তান যুদ্ধ-বিমানের হামলার শিকার হয় এবং এর পর থেকে সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনুষ্ঠান প্রচারণা বন্ধ হয়।  ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মোট ১৪ টি অধিবেশন সম্প্রচারিত হয়।

৩০ মার্চ, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে রক্ষিত ১ কিলোওয়াট শক্তির ট্রান্সমিটার ডিসমেন্টাল করে ব্যাঙ্কার সৈয়দুর রহমানের ট্রাকে করে সেনা প্রহরায় পটিয়া জমিরিয়া মাদ্রাসায় নিয়ে আসা হয়। পরে সেখান থেকে ট্রান্সমিটারটি দোহাজারী, বান্দরবান ও রামগড় হয়ে বিলুনিয়ার নিকটস্থ একটি পাহাড়ে গিয়ে সংস্থাপিত হয়।

১২ এপ্রিল, ১ কিলোওয়াট শক্তির এই ট্রান্সমিটার থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান সম্প্রচার আবার শুরু হয়।

দুই.

১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল কালুরঘাটের পতনের মধ্যে দিয়ে সমাপ্ত হওয়া কালুরঘাট প্রতিরোধ যুদ্ধ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য। ফলে এই প্রতিরোধ যুদ্ধের বিস্তারিত ইতিহাস সংগ্রহ করে কালুরঘাট প্রতিরোধ যুদ্ধ শিরোনামের প্রবন্ধের মাধ্যমে আমরা এই গ্রন্থে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছি। এছাড়াও বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতহিাসভিত্তিক অনেকগুলো প্রবদ্ধ এই গ্রন্থে অন্তর্ভূক্ত করেছি।  কালুরঘাট প্রতিরোধ যুদ্ধসহ এই প্রবন্ধগুলো রচনায় ফিল্ড ওয়ার্কের উপর নির্ভর করতে প্রবন্ধের মধ্য থেকে সুবেদার মেজর টি এম আলী বাহিনী, কেংড়াছড়ি অপারেশন, ১৫৫ নম্বর মাহবুবুর রহমান গ্রুপ, চিরিঙগা গণহত্যা, রানীহাট যুদ্ধ, রাঙ্গুনিয়া তহশিল অফিস অপারেশনে, রাঙ্গুনিয়া ফরেস্ট অফিস রাজাকার ক্যাম্প অপারেশন প্রভৃতি প্রবন্ধ ‌’এনসাইক্লোপিডিয়া ্ব বাংলাদেশ ওয়ার অব লিবারেশন প্রচেক্ট,  এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ’-এ ইতোমধ্যে প্রেরণ করা হয়েছে।

আমাদের বিশ্বাস, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই গ্রন্থ গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে চিহ্নিত হবে।  গ্রন্থটি প্রকাশের ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের ইতহিাস ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক জামাল উদ্দিন এবং আমার স্ত্রী শাহীন নুপুরের সহযোগিতার কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

শামসুল আরেফীন

 

৳ 250

About The Author

শামসুল আরেফীন

শামসুল আরেফীন

নেশা লেখালেখি হলেও পেশায় তিনি একজন সরকারি কর্মকর্তা । ১৯৭৬ সালে বেতার উপস্থাপক হিসাবে তাঁর কর্মজীবনের শুরু এবং ১৯৭৯ সালে সিনিয়র প্রযোজক পদে বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রাম কেন্দ্রে যোগদান করেন।
ছোট কাগজে, স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকের সাহিত্যপাতায় শামসুল আরেফীন দীর্ঘকাল ধরে কখনো প্রকৃত নামে, কখনো আরণ্য আরিফ ছদ্মনামে কবিতা লিখে সুনাম কুড়িয়েছেন। রুবাই রচনা শুরু শুণ্যের প্রথমে। প্রচুর রচনা করেছেন। “রুবাইত-ই-আরেফীন” –এ রুবাই সংখ্যা ২৫৯।
আরেফীনের জন্ম চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলার সদর এয়াকায় পিতা মাতা যথাক্রমে আবদুল মোবিন ও তমনারা বেগম। “রুবাইত-ই-আরেফীন” – এর পূর্বে আরেফীনের রচনা সম্পাদনায় ৮টি গ্রন্থ প্রকাশিতঃ আহমদ শফার ন্দুর মহল, গাঙ্গেয় বদ্বীপের অনন্য সঙ্গীতজ্ঞঃস্বপন কুমার দাশ, আস্কর আলী প্নডিতঃ একটি বিলুপ্ত অধ্যায়, বাংলাদেশের লোককবি ও লোকসাহিত্য প্রথম খন্ড, বাংলাদেশের লোককবি ও লোকসাহিত্য ২য় খন্ড-৪র্থ খন্ড, আস্কর আলী পন্ডিতের দুর্লভ পুথি জ্ঞান চৌতিসা ও পঞ্চসতী প্যারজান।

Reviews

There are no reviews yet.

Be the first to review “কালুরঘাট প্রতিরোধ যুদ্ধ ও অন্যান্য/KALURGHAT PROTIRODE JUDDHO O ONYANYO”

Your email address will not be published. Required fields are marked *