একাত্তরের শহীদ ছবুর /SAHID CHABUR

ভূমিকা

হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের পরিচয় আমরা বাঙালি। আমাদের দেশ বাংলাদেশ। কিন্তু এই বাংলাদেশটি আমরা নিজস্ব করে পেয়েছি। অনেক ত্যাগ, অনেক রক্ত, অনেক তিতিক্ষা এবং পরিশেষে তিরিশ লক্ষাধিক বাঙালির প্রাণের বিনিময়ে। পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইলের এই দেশটির এমন একটি জায়গা ছিল না, যেখানে শহীদের রক্ত ঝরেনি এবং তাঁদের অনেকের দেহাবশেষের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষিত নেই। কেউ ভেসে গেছে পদ্মা, মেঘনা, কর্ণফুলি নদীর বুকে, কেউ ভেসে গেছে অথৈ সমুদ্রের মাঝে, কেউ কেউ পাহাড়ে জঙ্গলে শেয়াল শকুনের আহাৰ্য্য হয়েছে, আর কিছু সংখ্যক মানুষকে সমাধিস্থ করা হয়েছে। তখন যেখানে সুযােগ হয়েছে সেখানে। পাশাপাশি অজস্র গণকবর আর বধ্যভূমিতে ভরেছিল এই দেশটি। এরকম পরিস্থিতিতে গাজী আবদুস ছবুরও শাহাদতবরণ করেছেন। | মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় পটিয়া থানার কেলিশহরের খিল্লা পাড়ার গুড়টিলা পাহাড়ে গাজী আবদুস ছবুর কবরস্থ হন। কিন্তু তার নিবাস ছিল পটিয়া থানারই ৪নং ওয়ার্ডের শেয়ানপাড়া গ্রামের গাজী বাড়িতে। তাঁর পিতার নাম গাজী আলী চান সওদাগর। মাতা ছমেরাজ খাতুন। ১৯৭১ সালে তরুণ ছেলে দুঃসাহসী আবদুস ছবুর তখন পটিয়া কলেজের ছাত্র। সে সময়ে তিনিও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং বীরত্ব সহকারে পাক হানাদারবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে মুক্তিবাহিনীর সুনাম অর্জন করেন। যুদ্ধ শেষে বীরত্বের বেশে তাঁর সঙ্গীসাথীরা অনেকেই বাড়িতে ফিরলেও আবদুস ছবুরের বাড়ি ফেরা হয়নি। মৃত্যুর সময় মাকে দেখার খুব আকুতি করেছিলেন শহীদ ছবুর । সহযােদ্ধাদের মৃত্যুকালীন সময়ে বলেছিলেন, খবরদার তােমরা হাত থেকে অস্ত্র ফেলাে না আমি মরে গেলেও দেশ স্বাধীন হবে। যুদ্ধকালীন সময়ে সে গিয়েছিল রাজাকার অপারেশনে পটিয়া কেলিশহরের ভট্টচার্য হাটে। এক রাজাকারকে তিনি ঝাপটে ধরে ফেলেছিলেন। সে সময় আরেক মুক্তিযােদ্ধা সেই রাজাকারকে গুলি করে। সেই গুলি রাজাকারের বক্ষ ভেদ করে মুক্তিযােদ্ধা গাজী আবদুস ছবুরের বুকে লাগে এবং তিনিও শাহাদতবরণ করেন।

আজ ৪৪ বছর পর অনেক প্রশ্ন জেগেছে অনেকের মনে তার মৃত্যু নিয়ে। ছবুরের বন্ধুরা কেউ কেউ মনে করেন তাকে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে মারেনি, রাজাকারকে মারতে গিয়ে মিস ফায়ারে তিনি নিহত হয়েছেন। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে গুলিবিদ্ধ আবদুস ছবুরকে তখন হাসপাতালে কেন নেওয়া হয়নি? কেন খিল্লা পাড়ার গুড়টিলা পাহাড়ে কবর দেওয়া হয়েছে ইত্যাদি আজ অনেক প্রশ্ন অনেকের মনে জাগা স্বাভাবিক। কিন্তু দেখতে হবে ৪৪ বছর আগের সেই সময়কার পরিস্থিতি। কেলিশহর গ্রামের অদূরে সেই দুর্গম এলাকার খিল্লা পাড়ার গুড়টিলা পাহাড় থেকে বুকে গুলিবিদ্ধ আবদুস ছবুরকে নামিয়ে এনে হাসপাতালে নেওয়া হয়, তাে কারাে পক্ষে সম্ভব হয়নি কিংবা কারাে মনেই জাগেনি, সহযােদ্ধারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে নিজেরাই চেষ্টা করেছিলেন বাঁচাতে, তাছাড়া সে সময় চারিদিকে পাকবাহিনী ও রাজাকার বাহিনীর বেশ বিচরণ ও ছিল। কিন্তু এই বিলম্বের কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল এবং সেখানেই তাঁকে কবরস্থ করা হয় ও কবরের চারপাশে ইট দিয়ে গাঁথুনি দেওয়া হয়। সে কারণে এ গ্রন্থের লেখক রশীদ এনাম শহীদ গাজী আবদুস ছবুরের ছােট ভাই গাজী সেলিমকে নিয়ে খুঁজে পেয়েছিলেন সেই কবর। সিএনজি ট্যাক্সিতে লেখক সেখানে পৌছে দেখেন ১৮ বছর আগের সেই খিল্লা পাড়া এখন আর নেই, অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সে সময়ের বাঁশের সাঁকো নেই এখন পাকা ব্রিজ হয়েছে, শহীদ গাজী আবদুস ছবুরের কবরের কাছাকাছি পূর্ব পাশে সরকারি খাস জমিতে সাড়ে ৫৮ লক্ষ টাকা ব্যয়ে একটি ইশকুল তৈরি করা হচ্ছে। ইশকুলটির নাম করা হয়েছে। শহীদ আবদুস ছবুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেই স্কুলটির পাশেই ছােট একটি লেক। এই লেকের পানিতেই শহীদ ছবুরকে গােসল করানাে হয়েছিল লিখেছেন রশীদ এনাম।।

কিন্তু দেশমুক্ত হওয়ার পর থেকে ঘটে গেছে অনেকগুলাে ঘটনা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা, জাতীয় চার নেতাকে হত্যা ইত্যাদি। ১৯৭৫ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত আমাদের এই দেশটি ছিল স্বৈরাচার রাজাকার জামায়াত শিবিরের হাতে বন্দী। সেই সাথে স্বাধীনতা বিরােধিরা যতটা পেরেছে মুক্তিযুদ্ধের অজস্র স্মারক চিহ্ন এবং গণকবর ও বধ্যভূমিগুলাে মুছে ফেলে ঘরবাড়ি তৈরি করেছে, যত্রতত্র শহীদদের অনেক চিহ্ন মুছে ফেলতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মানুষ যারা আজো বেঁচে আছেন, তাঁদের কথায় তাদের লেখায় বর্তমান প্রজন্ম আজ জেগে উঠছে, ইতিহাস পড়ে জানতে পারছে একাত্তরের কথা মুক্তিযুদ্ধের কথা। তারাই আজ খুঁজে বের করছে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস এবং স্মৃতিচিহ্নগুলাে। এভাবে উঠে আসছে শহীদ গাজী আবদুস ছবুরেরও নাম । | দেশবাসী জানতে পারছে শহীদ ছবুরের বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া থানার শেয়ানপাড়া গ্রামের নাম । সেই সাথে আজ জানছে শেয়ানপাড়া গাজী বাড়ি সংলগ্ন শহীদ আবদুস ছবুর পাঠাগারটির কথা, যেটি পরবর্তীতে বন্ধ করে দিয়েছিল তাঁরই গ্রামেরই লােকজন। কিন্তু সত্য থাকে চিরদিন অমলিন। আজ একাত্তরের প্রজন্ম লেখক রশীদ এনাম তুলে এনেছেন শহীদ আবদুস ছবুরকে। উঠে এসেছে মুক্তিযােদ্ধা শহীদ আবদুস ছবুর স্মৃতি পাঠাগার ও শহীদ আবদুস ছবুর স্মৃতি ট্রাস্টের কথা এবং এই শেয়ানপাড়া গ্রামেই শহীদ ছবুরের নামে একটি কলেজ ও স্মৃতি স্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। এভাবেই তার স্মৃতি ও কর্মকান্ড প্রজন্মের পর প্রজন্মের মাঝে বেঁচে থাকবে। তবে তাঁর কবর যেখানে আছে তা আরাে সুন্দর সুসংহত করে যাতায়াতের সুব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাই।

 (বেগম মুশতারা শাফ)

২৫/১২/২০১৫ ‘মুশতারী লজ, এনায়েতবাজার, বাটালী রােড, চট্টগ্রাম।

৳ 200

About The Author

রশীদ এনাম

রশীদ এনাম

সাপ্তাহিক বীর চট্টগ্রাম মঞ্চে (বর্তমানে দৈনিক) পটিয়া প্রতিনিধি হিসেবে কিছুদিন সাংবাদিকতা করেছেন। নিয়মিত লিখতেন চট্টগ্রামের আজাদী, পূর্বকোণসহ কয়েকটি দৈনিকে। জাতীয় দৈনিক পত্রিকায়ও তাঁর অনেক ছােটগল্প ও ফিচার ছাপা হয়। নিয়মিত কলাম লিখছেন ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সাময়িকী ইতিহাসের খসড়ায়। ঢাকায় ওই সাময়িকীটির সমন্বয় সহকারী হিসেবে কাজ করছেন। চট্টগ্রামের সাহিত্যবিষয়ক লিটল ম্যাগ ‘জলছবি’র সহসম্পাদক। শুধু লেখালেখিতে থেমে নেই। সামাজিক দায়বদ্ধতায় ভালােবাসার হাত বাড়িয়েছেন পথশিশুদের প্রতি। দুস্থ শিশুদের জন্য কাজ করা বর্ণের হাতেখড়ি' সংগঠন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সাধারণ সম্পাদক। পথশিশুদের জন্য ওই সংগঠন পরিচালিত ‘হেল্পলেস চাইল্ড স্কুল প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবেও সুনাম রয়েছে তাঁর। নিজ এলাকা পটিয়ায় প্রতিষ্ঠা করেছেন মাদক ও তামাকবিরােধী সংগঠন 'মাতাবিস'। পটিয়ার সৃজনশীল সাহিত্য গােষ্ঠী মালঞ্চ-এর সংগঠক এবং পটিয়া চার নম্বর ওয়ার্ডের নেজাম স্মৃতি স্পাের্টিং ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। কাজ করেছেন প্রথম আলাে চট্টগ্রাম জেলা বন্ধুসভায় এবং বাংলাদেশ গণিত অলম্পিয়াডে। প্রতিবন্ধীদের অধিকার অর্জনে নিবেদিত সংগঠন বি-স্ক্যান (বাংলাদেশ সােসাইটি ফর চেঞ্জ অ্যান্ড অ্যাডভােকেসি নেক্সাস) এর নির্বাহী সদস্য এবং চট্টগ্রাম সমিতি, ঢাকার আজীবন সদস্য।পুরাে নাম মুহাম্মদ এনামুর রশীদ। রশীদ এনাম নামেই লেখালেখি করেন। জন্ম ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৮১ ইংরেজি। জন্মস্থান চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া পৌরসভার চার নম্বর ওয়ার্ডের লালমিয়া গান্ধির বাড়ি। বাবা ফিরােজ আহমেদ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কৃষি কর্মকর্তা। মা জাহেদা আহমেদ গৃহিণী। রশীদ এনাম পটিয়া পৌর এলাকার শেয়ানপাড়া পশ্চিম পটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা নেন। ১৯৯৬ সালে পটিয়া আবদুস সােবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং পটিয়া সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। হিসাববিজ্ঞানে সম্মান করেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে। চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজ থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রথম চাকরি মােবাইল ফোন কোম্পানি বাংলা লিংকে। যােগ দেন। গ্রাহকসেবা কর্মকর্তা হিসেবে। বর্তমানে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লিঃ এর প্রধান কার্যালয়ের আইসিসি বিভাগে কর্মরত। তার শৈশবের পুরােটা সময় কাটে গ্রামেই। দুরন্ত দস্যিপনায় বেড়ে ওঠা রশীদ এনামের লেখালেখি শুরু স্কুলবেলায়। বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মীদের আড্ডার প্রাণবন্তমুখ এই তরুন লেখককে সবাই চেনে একজন। ‘স্বপ্নবাজ গল্পকার হিসেবে।

Reviews

There are no reviews yet.

Be the first to review “একাত্তরের শহীদ ছবুর /SAHID CHABUR”

Your email address will not be published. Required fields are marked *