আস্কর আলী পণ্ডিত ছিয়াশি বছর পর

১৯৪৬ সালে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার পুরানগড়ে জন্মগ্রহণকারী ও পরবর্তীতে পটিয়া উপজেলার শোভনদণ্ডি গ্রামে স্থায়ী বসতিস্থাপনকারী, মোসরফ আলির পুত্র আস্কর আলী পণ্ডিত (মৃত্যু ১১ মার্চ ১৯২৭) স্বকালে বড়োমাপের কবি বা লোককবি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর সময়ে আধুনিক সাহিত্য রচনা দেদারসে চললেও চট্টগ্রামের গ্রামীণ বা লোকসমাজে তাঁর রচিত লোকসাহিত্য তথা মূলধারার বাংলা সাহিত্য মনের খোরাক জোগায়। তাঁর সময়ে, সোজাসুজি বললে তখন থেকে এখন পর্যন্ত তাঁর প্রভাবমুক্ত লোককবি বিশেষ করে চট্টগ্রামে অত্যন্ত অল্প। সেকান্দর আলী ওরফে সেকান্দর গাইন (১৮৬০-১৯৪২), খায়েরজ্জমা পণ্ডিত (১৮৭৬-১৯৫১), মকবুল আহমদ পণ্ডিত (১৮৫০-১৯৩৪), রমেশ শীল (১৮৭৭-১৯৬৭), কবির বখশ (১৮৭৯-১৯৩৮), দলিলুর রহমান পণ্ডিত (? – ১৫ জুন ১৯১৯), মো. হাছন আলী, মোহাম্মদ হারুন, মোহাম্মদ নাসির (১৯০৩-১৯৭৯), মলয়ঘোষ দস্তিদার (১৯২০-১৯৮২), অচিন্ত্যকুমার চক্রবর্তী (১৯২৬-১৯৯৪), মোহনলাল দাশ (১৯২৬-১৯৭৪), এম এন আকতার (১৯৩১-২০১২), আবদুল গফুর হালী (১৯৩৬-), শাক্যমিত্র বড়–য়া, সৈয়দ মহীউদ্দিন (১৯৫৩-), সঞ্জিত আচার্য (১৯৫৫-), রুহুল আমিন (১৯৫২-) প্রমুখ তাঁর সুরে কথা বসিয়ে গান রচনা করেন। খায়েরজ্জমা পণ্ডিতের বেনারসি শাড়ি গায় / আনা ধরি সিতা পাড়ে ভইনে খিড়কীর কিনারায়, সেকান্দর গাইনের গুরুজির চরণ মানি / পইট্টা জিলা শেষ গরিল রেয়াল কোম্পানি, অচিন্ত্যকুমার চক্রবর্তীর সূর্য উডের লে ভাই লাল মারি / রইস্যা বন্ধু ছাড়ি গেল গই আঁর বুগত ছেল মারি, আবদুল গফুর হালীর শুইলে ঘুমে ন ধরে / ঘরর মানুষ বাইরে রইয়ে বুলি তার লায় পেট পোড়ে, মলয়ঘোষ দস্তিদারের ছোড ছোড ঢেউ তুলি পানিত / লুসাই পাহাড়ত্তুন লামিয়ারে যারগই কর্ণফুলী প্রভৃতি গানে আস্কর আলী পণ্ডিতের বসি রইলি ওমন কার আশে / রঙ্গের বাজার অথবা বেজার কল্যাম বন্ধুরে / সারা নিশী ঘুমে না ধরে (এ গান অনুকরণ করে খায়েরজ্জমা পণ্ডিতও একটি গান লিখেন) গানের সুর। রমেশ শীলের আঁধার ঘরত রাইত কাডাইয়ম কারে লই / বন্ধু গিয়ে গই, এম এন আকতারের কইলজার ভিতর গাঁথি রাইখ্যম তোঁয়ারে / সিনার লগে, রুহুল আমিনের বন্ধুর লাগি কাঁদেরে আঁর পরান্নান / এত গরি কইলাম প্রভৃতি গানে আস্কর আলী পণ্ডিতের মন পাখিরে বুঝাইলে সে বোঝে না / প্রবোধ মানে না গানের সুর। এ থেকে অনুধাবনযোগ্য, ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে বর্তমান পর্যন্ত চট্টগ্রামে আবির্ভুত লোককবিদের তিনিই একমাত্র পথিকৃত। এক লোককবি তাঁর সম্পর্কে লিখেন :

শোভনদণ্ডী কবির রাজ্য রসের রঙ্গে আনন্দিত

মোহামান্য ধর্ন্ন ধর্ন্ন আস্কর আলী সুপণ্ড্রিত ॥

জ্ঞান চৌতিসা, পঞ্চসতী প্যারজান, হাদিসবাণী প্রভৃতি পুথি অনুকরণ ও অনুসরণ করে চট্টগ্রামে পুথি বা মূলধারার সাহিত্য রচনায় কেউ এগিয়ে এসেছেন, এমনটি আমাদের লক্ষ্যগোচর হয়নি।

গ.

ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে বর্তমান পর্যন্ত চট্টগ্রামে আবির্ভুত লোককবিদের একমাত্র পথিকৃত কিংবা মূলধারার বাংলা সাহিত্যের অন্যতম হলেও আস্কর আলী পণ্ডিতের কোন মূল্যায়ন হয়নি। দীর্ঘসময় ধরে ফিল্ড ওয়ার্কের মাধ্যমে আমি ২০০৬ সালে আস্কর আলী পণ্ডিত : একটি বিলুপ্ত অধ্যায় এবং ২০১০ সালে আস্কর আলী পণ্ডিতের দুর্লভ পুথি জ্ঞান চৌতিসা ও পঞ্চসতী প্যারজান নামে দুটি গ্রন্থ প্রকাশ করি। এছাড়া ২০০৭ এবং ২০০৮ সালে আমার প্রকাশিত যথাক্রমে বাঙলাদেশের লোককবি ও লোকসাহিত্য-প্রথম খণ্ড এবং বাঙলাদেশের লোককবি ও লোকসাহিত্য-২য়-৪র্থ খণ্ড গ্রন্থদ্বয়েও তাঁর সম্পর্কে আলোচনা ও তাঁর গান উপস্থাপন করি। এবার প্রকাশিত হলো আস্কর আলী পণ্ডিত : ছিয়াশি বছর পর। উপমহাদেশের অন্যতম পণ্ডিত যতীন সরকারসহ বাংলাদেশের নানা প্রান্তের অনেকেই লিখেছেন। সকলের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। একটা কথা না বললেই নয়, এঁদের লেখা আমি সংগ্রহ করি আস্কর আলী পণ্ডিত স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে ২০১১ সালের ২৩ এপ্রিল আয়োজিত আস্কর আলী পণ্ডিত মেলা ও স্মরণসভার ম্যাগাজিনের জন্য। নানা কারণে আস্কর আলী পণ্ডিত স্মারক নামক ম্যাগাজিনটিতে লেখাগুলো ছাপানো যায়নি। বিশেষত এ জন্যে আস্কর আলী পণ্ডিত : ছিয়াশি বছর পর এর প্রকাশ। গ্রন্থটি প্রকাশের ক্ষেত্রে আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ যতীন সরকারের কাছে, যেহেতু আমার নিমোক্ত চিঠি প্রাপ্ত হয়ে ভীষণ অসুস্থতার মধ্যেও তাঁর লেখাটি প্রেরণ করেন।

 

বরাবর

যতীন সরকার

বানপ্রস্থ

রামকৃষ্ণ মিশনের পাশে

সাতপাই, নেত্রকোণা।

 

দাদা,

নমস্কার জানবেন। আমি জানি, আপনি খুবই অসুস্থ। তারপরও একটি নিবেদন নিয়ে হাজির হয়েছি। চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলার পুরানগড়ে ১৮৪৬ খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণকারী লোককবি আস্কর আলী পণ্ডিত নিয়ে আমার প্রণীত একাধিক গ্রন্থ আপনার সংরক্ষণে। তাঁর সম্পর্কে আপনি ভালভাবেই অবগত। মুন্সী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ও ড. আহমদ শরীফের জন্ম যেখানেÑ সেই পটিয়া উপজেলার শোভনদণ্ডি গ্রামে পণ্ডিত স্থায়ী বসতি গড়েন। তিনি দীর্ঘ ৮১ বছর জীবত ছিলেন। মৃত্যুবরণ করন ১১ মার্চ ১৯২৭ (১২৮৮ মঘী ২৭ ফাল্গুন)। জীবদ্দশায় লোকসাহিত্যের বিরাট ভাণ্ডার সৃষ্টি করেন। অথচ চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশে তাঁর কোন মূল্যায়ন হয়নি। তাঁর রচনা বিলুপ্তির পথে। সম্প্রতি শোভনদণ্ডি গ্রামে গঠিত হয়েছে আস্কর আলী পণ্ডিত স্মৃতি সংসদ। লক্ষ্য, পণ্ডিতের কথা ও তাঁর রচনা সংগ্রহ করে জাতির সকাশে তুলে ধরা। এই স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে আগামী ২৫ ও ২৬ মার্চ দু’দিন ব্যাপী শোভনদণ্ডি গ্রামে আস্কর আলী পণ্ডিত মেলা ও স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দেশ-বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকছেন। সঙ্গে থাকছে আস্কর আলী পণ্ডিত পদক ঘোষণা। আস্কর আলী পণ্ডিত স্মারক নামে একটি ম্যাগাজিনও প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। আপনার কাছে আমার নিবেদন, এই ম্যাগাজিনে একটি লেখা আপনি লিখবেন। আমার বিশ্বাস, আপনি লিখলে একদিকে ম্যাগাজিনের শ্রী বৃদ্ধি হবে, অন্যদিকে অদূর ভবিষ্যতে পণ্ডিতের মূল্যায়নের পথ সুপ্রশস্থ হবে।

 

আপনার øেহধন্য

শামসুল আরেফীন

চন্দনাইশ, চট্টগ্রাম

১০.০৩.২০১১

 

চিঠিতে ২০১১ সালের ২৫ ও ২৬ মার্চ দু’দিনব্যাপী আস্কর আলী পণ্ডিত মেলা ও স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হবে, উল্লেখিত। এটা ছিল আস্কর আলী পণ্ডিত স্মৃতি সংসদের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত।

পরিশেষে বলাকা প্রকাশনের জামাল উদ্দিনের কাছে,Ñ যিনি ইতোমধ্যে বড়োমাপের ইতিহাসকার হয়ে উঠেছেন, স্বীকার করছি আন্তরিক ঋণ।

 

শামসুল আরেফীন

৳ 250

About The Author

শামসুল আরেফীন

শামসুল আরেফীন

নেশা লেখালেখি হলেও পেশায় তিনি একজন সরকারি কর্মকর্তা । ১৯৭৬ সালে বেতার উপস্থাপক হিসাবে তাঁর কর্মজীবনের শুরু এবং ১৯৭৯ সালে সিনিয়র প্রযোজক পদে বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রাম কেন্দ্রে যোগদান করেন।
ছোট কাগজে, স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকের সাহিত্যপাতায় শামসুল আরেফীন দীর্ঘকাল ধরে কখনো প্রকৃত নামে, কখনো আরণ্য আরিফ ছদ্মনামে কবিতা লিখে সুনাম কুড়িয়েছেন। রুবাই রচনা শুরু শুণ্যের প্রথমে। প্রচুর রচনা করেছেন। “রুবাইত-ই-আরেফীন” –এ রুবাই সংখ্যা ২৫৯।
আরেফীনের জন্ম চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলার সদর এয়াকায় পিতা মাতা যথাক্রমে আবদুল মোবিন ও তমনারা বেগম। “রুবাইত-ই-আরেফীন” – এর পূর্বে আরেফীনের রচনা সম্পাদনায় ৮টি গ্রন্থ প্রকাশিতঃ আহমদ শফার ন্দুর মহল, গাঙ্গেয় বদ্বীপের অনন্য সঙ্গীতজ্ঞঃস্বপন কুমার দাশ, আস্কর আলী প্নডিতঃ একটি বিলুপ্ত অধ্যায়, বাংলাদেশের লোককবি ও লোকসাহিত্য প্রথম খন্ড, বাংলাদেশের লোককবি ও লোকসাহিত্য ২য় খন্ড-৪র্থ খন্ড, আস্কর আলী পন্ডিতের দুর্লভ পুথি জ্ঞান চৌতিসা ও পঞ্চসতী প্যারজান।

বলাকা প্রকাশনঃ

আস্কর আলী পণ্ডিত আমাদের দ্বারা লোককবি অভিধায় চিহ্নিত হলেও তিনি মূলধারার বাংলা সাহিত্যের কবিও বটে। লোকসমাজে জন্ম হওয়ায় পরিচয়ের এমন স্বরূপ। আধুনিক বাংলা সাহিত্য সুধীসমাজে লালিত ও মূল্যায়িত হলেও পূর্বে মূলধারার বাংলা সাহিত্য লোকসমাজেই লালিত হয়। ড. সত্যব্রত দে চর্যাগীতি পরিচয় গ্রন্থের ১০০ পৃষ্ঠায় চর্যাপদ সম্পর্কে বলেন : “একতা চর্যাগীতি সমাজে জনপ্রিয় মর্যাদায় বহুল প্রচলিত ছিল এবং সম্ভবত নিষেধ সত্ত্বেও সঙ্গীতরস উপভোগের জন্য অদীক্ষিত জনসাধারণও চর্যাগীতি আস্বাদন করিতেন। চর্যাগীতির এই জনপ্রিয়তাই পরবর্তী সঙ্গীতশাস্ত্রগুলির মধ্যে ইহার উল্লেখ ও বি¯তৃত বিবরণ প্রদানের প্রেরণা। সুতরাং আজ চর্যাগীতি লিখিতরূপে আমাদের কাছে আসিয়া উপস্থিত হইলেও একদা চর্যাগীতিগুলি লোকমুখে প্রচলিত ও জনপ্রিয় সঙ্গীত-রীতি হিসাবেই পরিচিত ছিল” [পরিমার্জিত চতুর্থ সংস্করণ; জানুয়ারি ১৯৯৭; প্রকাশক : মঞ্জুলিকা ভট্টাচার্য; ১৭১/১/১ বি রাসবিহারী এভেনিউ, কলিকাতা ৭০০ ০১৯]।

মূলধারার বাংলা সাহিত্য অর্থাৎ চর্যাপদ এবং মধ্যযুগ-অবক্ষয় যুগে রচিত সাহিত্য লোকসমাজে লিখিত বা প্রতিলিপিরূপে এবং মৌখিকভাবে লালিত হয়। বংশ পরম্পরায় মৌখিকভাবে লালিত হওয়া ছিল সংরক্ষণের অন্যতম উপায়। কেননা ওই সময়কালে লিখে রাখার ব্যাপার ছিল কঠিন, কষ্টসাধ্য। চর্যাপদ লিখিত হয় তালপাতায়। মধ্যযুগ-অবক্ষয় যুগে রচিত সাহিত্য লিখিত হয় তুলট কাগজ প্রভৃতিতে। চট্টগ্রাম থেকে মধ্যযুগ অবক্ষয় যুগে রচিত সাহিত্যের অনেকাংশের লিখিতরূপ বা প্রতিলিপি পাওয়া গেছে। এসব উদ্ধার করেন মুন্সী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, আবদুস সাত্তার চৌধুরী, ড. এনামুল হক প্রমুখ। এসবের মধ্যে আছে মঙ্গলকাব্য, প্রণয়কাব্য, কাহিনীকাব্য প্রভৃতি। এছাড়াও আছে অনেক বারমাসি ও গীতিকা।

ঊনিশ-বিশ শতকেও মধ্যযুগ-অবক্ষয় যুগের অনুসরণে সাহিত্য চর্চা চলে। আস্কর আলী পণ্ডিত এ-সময়েই নিরলসভাবে নিরন্তর সাহিত্য রচনা করেন। লোকসমাজে জন্ম হওয়ায় একদিকে লোকসংস্কৃতি, অপরদিকে লোকসমাজে লিখিত ও মৌখিকভাবে লালিত মূলধারার বাংলা সাহিত্য দ্বারা তীব্র প্রভাবিত হন। ফলে তাঁর থেকে লোকসাহিত্য ও মূলধারার বাংলা সাহিত্য উভয়ই আমরা পাই। লোকসাহিত্যে তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা গান। কী জ্বালা দি গেলা মোরে, ডালেতে লড়িচড়ি বৈও চাতকি ময়নারে, কেউরে ন বুঝাইয়মরে আঁর পরাণবন্ধু কালা, বসি রইলি ওমন কার আশে / রঙ্গের বাজার, মন পাখিরে বুঝাইলে সে বোঝে না / প্রবোধ মানে না, ঘনার দিন ত যারগৈরে ফুরাই আর ত ফিরি ন আইব, বাতাসের রিত না বুঝি সুজন মাঝি ভাসায় দিছে, পরবাইস্যারে-ওরে ও পরবাইস্যারে ফজরত আঁই ধইরলাম নলর কুডি, ন মাতাই ন বোলাই গেলিরে বন্ধুয়া, কী লইয়া যাইয়ুম ঘরে সন্ধ্যাকালে, এক সের পাবি দেড় সের খাবি ঘরত নিবি কী, দেখি না দেখিলো মোরে, হাউসের যৌবন আমার শেষ করি / বন্ধু যায়, এইবার মরিব আমি বিষ খাইয়া ননদিয়াÑ প্রভৃতি গান উল্লেখ করার মত। তাঁর সঙ্গীত-সংকলনও রয়েছে অনেক। যেমনÑ নন্দবিলাস, নন্দবেহার : প্রথম ভাগ, গীত বারমাস (ক. গীত বারমাস ২য় ভাগ), হাফেজ বাহাদুর (গীত, বারমাস ও কবিতা : প্রথম ভাগ), নন্দসাগর প্রভৃতি। মূলধারার বাংলা সাহিত্যে তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা পুথি। যেমনÑজ্ঞান চৌতিসা, পঞ্চসতী প্যারজান, হাদিসবাণী প্রভৃতি। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃত ভাষার প্রভাবযুক্ত জ্ঞান চৌতিসা ও পঞ্চসতী প্যারজান (পঞ্চসতী প্যারজানে দেবনাগরী ভাষার ব্যবহারও লক্ষণীয় বটে) প্রণয় কাব্য। জ্ঞানচৌতিসায় জ্ঞান ও চৌতিসা কন্যার এবং পঞ্চসতী প্যারজানে দিদার সুখ ও প্যার জানের প্রণয়কাহিনি সন্নিবেশিত। জ্ঞান চৌতিসা প্রণয়কাব্য হলেও সেখানে মরমি বা আধ্যাত্মিক দর্শনের চর্চা লক্ষ্য করার মতো। জ্ঞান চৌতিসায় এ দর্শনের চর্চা করতে প্রণয়কাহিনির আশ্রয় নেয়া হয়Ñ এমনটি অনায়াসে ভাবা যেতে পারে। ষোল শতকে সৈয়দ সুলতান জ্ঞান চৌতিসা, জ্ঞান প্রদীপ এবং হাজী মুহম্মদ সুরতনামা বা নুরজামাল প্রভৃতি কাব্যের মাধ্যমে মরমি দর্শন চর্চা করেন। ঊনিশ-বিশ শতকে জ্ঞান চৌতিসা নামে পুথি বা প্রণয়কাব্য রচনার মাধ্যমে আস্কর আলী পণ্ডিতের মরমি দর্শন চর্চা প্রমাণ করে তিনি তাঁদের সুযোগ্য উত্তরসূরি। পঞ্চসতী প্যারজানে কোন দর্শনের চর্চা অলক্ষ। একে স্রেফ অতি কল্পনাশ্রয়ী প্রণয়কাব্য বিবেচনা করা যায়। তবে হ্যাঁ, আবহমান বাংলার সাধারণ মানুষ সুপ্রাচীনকাল থেকে বিশ্বাস ও মান্য করে আসছেÑ শাস্ত্রীয় এমন কিছু বিষয়-আশয় বা রীতিনীতি এখানে উপস্থাপিত, যা থেকে বলা যায়, এতে সমাজ-বাস্তবতার সামান্য ছোঁয়াও বিদ্যমান।

হাদিসবাণী পুথিটি মুন্সী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ সংগৃহীত। তবে তিনি মনে করতেন, হাদিস-কালাম-বাণী পুথির রচক লোকমান আলীই এর রচয়িতা।

Reviews

There are no reviews yet.

Be the first to review “আস্কর আলী পণ্ডিত ছিয়াশি বছর পর”

Your email address will not be published. Required fields are marked *