Blog

আরাকান রাজসভায় মুসলিম নেতৃবর্গের গর্বের ইতিহাস

বলাকা প্রকাশনঃ

আরাকান রাজসভায় মুসলিম নেতৃবর্গের গর্বের ইতিহাস

জামাল উদ্দিন

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গমস্থলে সমুদ্র তীরবর্তী হাজার বছরের প্রাচীন জনপদ আরাকান। ঐতিহাসিকভাবে রাজ্যটি ছিল বরাবরই স্বাধীন ও অতিশয়  সমৃদ্ধশালী। ম্রোহং বা রোসাঙ্গ শহরকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠেছিল এই রাজ্যের রাজধানী। চট্টগ্রাম, পেগু ও আরাকান, এই তিন জনপদের মধ্যেই আবর্তিত হয়েছে এই রাজ্যের পরিধি।  ইতিহাসের পেছনে তাকালে দেখা যায়, খ্রিস্টপূর্ব দুই শতক হতেই ইয়েমেনিয় ও ব্যাবিলনিয় অঞ্চলের আরবগণ (অমুসলিম আমলের) সমুদ্র বিদ্যায় পারদর্শীতার কারণে চীন ও ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকারী ছিল। যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে, তখন ভৌগোলিকভাবে চট্টগ্রাম ছিল অধুনা-লুপ্ত আরাকান রাজ্যের একটি অঞ্চল। এই রাজ্যের অন্যতম বন্দর শহর চট্টগ্রাম ও আকিয়াব বিশ্ব বাণিজ্যের সে সময়ের দুই সমৃদ্ধ কেন্দ্র। সুতরাং প্রাচ্যের প্রবেশদ্বার হিসেবে চট্টগ্রাম-আরাকানে কাল-কালান্তরে বিভিন্ন জাতি, সভ্যতা ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন ছিলো অবারিত ও অবধারিত, যা বিদেশী বণিক, যোদ্ধা, জনজাতির রক্তের নৃতাত্ত্বিক মিশ্রণও ঘটিয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব কালের দুর্ধর্ষ আর্যীকরণের প্রবল প্রভাব থেকেও এ অঞ্চল মুক্ত থাকে নি। প্রকৃতপক্ষে, সমুদ্র, মেখলা, গিরি, কুন্তলা এবং পাহাড়-পর্বতবেষ্টিত আদি আরাকান রাজ্যের বন্দর সুবিধা, বাণিজ্য প্রসার, প্রাকৃতিক অঢেল সম্পদ, ভূ-রাজনৈতিক-রণকৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, এমনকি তৎকালীন নৌ-প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ইত্যাদির কারণে প্রাচীন শক্তিশালী সামরিক জাতিসমূহের নিকট এ অঞ্চল সবসময়েই আকর্ষণীয় ও ঈর্ষণীয় ছিলো। ফলে এ অঞ্চলের জনজীবন, সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই যে সার্বক্ষণিক সাংঘর্ষিক অবস্থা বিরাজ করতো তা সহজেই অনুমেয়। অস্বীকার করা যাবে না যে, এ রাজ্যটি ছিলো সবসময়েই দইধঃঃষবমৎড়ঁহফ ড়ভ ঃযব হবরমযনড়ঁৎরহম ধসনরঃরড়ঁং সড়হধৎপয’. এই তথ্য-উপাত্তের সাদামাটা অর্থ এই যে, আরাকান ও চট্টগ্রামবাসীকে সবসময়েই কোন না কোনভাবে যুদ্ধপরিস্থিতির মধ্যে কাটাতে এবং সংগ্রামী হতে হয়েছে। অষ্টম শতকে আরব্য বণিকরা ব্যবসা-বাণিজ্য উপলক্ষে এবং ফকির-দরবেশরা ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম-আরাকানে আগমন করেন। ৭৮৮ হতে ৮১০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মহত ইঙ্গ চন্দ্র নামে একজন রাজা আরাকান রাজ্যের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এই সময়ে একদল আরব বণিক পালের জাহাজে ‘রামরী দ্বীপে’র নিকটে পৌঁছলে ঘটনাক্রমে জাহাজ ভেঙ্গে যায়। বণিকদল বিপন্ন হয়ে তীরে অবতরণ করেন। রাজার আদেশে তারা আরাকানরাজ্যে বাস করার অধিকার পান। এই বণিকেরা স্থানীয় নারীর সাথে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের ঔরশে জন্ম নেয়া সন্তান-সন্ততিরাই হলো আরাকানে রাজ্যের ভূমিপুত্র বা আদি জনগোষ্ঠি, আধুনিক কালে যারা মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি নামে পরিচিত। ১০৪৪ খ্রিস্টাব্দে অনরথ নামক এক রাজা এ অঞ্চলের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রাষ্ট্রগুলোকে একত্রিত করে একটি একচ্ছত্র রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন এবং পগান প্রদেশে তিনি রাজধানী স্থাপন করেন। রাজা অনরথের রাজত্বকালকে স্বর্ণকাল বলা চলে। বৌদ্ধধর্মে অতিমাত্রায় অনুরক্ত এই রাজা শহরজুড়ে অনেক মন্দির ও প্যাগোডা নির্মাণ করেন। ত্রয়োদশ শতকের শেষের দিকে এই রাজ্যের একদিকে ‘শান’ ও আরেকদিক থেকে  ‘মোঙ্গল’ জাতি দখল করে এবং একে ভেঙ্গে পুনরায় ছোট ছোট রাষ্ট্রে পরিণত করে। চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি দেশটি চারটি অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। রাজ্যগুলো হলো উচ্চ বার্মা, নিু বার্মা, শান প্রদেশ ও আরাকান প্রদেশ। এসব প্রদেশগুলোর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগে থাকতো। আরাকানে মগধ বংশের রাজা অযুথোকে হত্যা করে তাঁরই ভাই সিংহাসনে আরোহণ করেন। কিন্তু অযুথোর পুত্র যুবরাজ নরমিখলা ১৪০৪ খ্রিস্টাব্দে চাচাকে হত্যা করে পিতার সিংহাসনে আরোহণ করেন।

১৪০৬ খ্রিস্টাব্দে এক অবাঞ্চিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে আভার রাজা মেঙৎ শোঅই ( মিন কৌং) আরাকান আক্রমণ করে। তিনি নরমিখলাকে (১৪০৪-১৪৩৪) পরাজিত করে আরাকান দখল করেন। নরমিখলা বাংলার (গৌড়ের) সুলতানের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করে তার রাজ্য উদ্ধারে সামরিক সাহায্য প্রার্থনা করেন। নানান ঘটনা প্রবাহের কারণে আশ্রয়ের দীর্ঘ ২৪ বছর পর ১৪৩০ খ্রিস্টাব্দে জালালুদ্দীন মুহম্মদ শাহ (১৪১৪-১৪৩১ খ্রি.) সেনাপতি ওয়ালী খানের নেতৃত্বে গৌড়ের বিশাল সেনাবাহিনী সহ নরমিখলাকে আরাকান রাজ্যে প্রেরণ করে। গৌড়ের সেনাবাহিনী  আভার রাজা মেঙৎ শোঅই (মিন কৌং) কে পরাজিত করে নরমিখলাকে স্বরাজ্য পুনরুদ্ধার করে দেন। তখন থেকে আরাকান রাজ্য গৌড়ের করদরাজ্যে পরিণত হয়ে যায়।  নরমিখলার সঙ্গে আরাকান পুনরুদ্ধাদের যুদ্ধে গৌড়ের সেনাবাহিনীসহ যেসব মুসলমান আরাকানে আসেন, তারা সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং আরাকানের রাজধানী মোহং-এ  যুদ্ধ বিজয়ের স্মারক হিসেবে ‘সন্ধিকন’ নামে একটি মসজিদও প্রতিষ্ঠিত করেন। গৌড়ের সেনাপতি ওয়ালী খান আরাকানের রাজা নরমিখলার দরবারে কাজী নিযুক্ত হন, এবং তখন থেকে আরাকানে ফার্সী ভাষা চালু হয়। মুসলিম জনপদ আরাকান রাজদরবারে এটাই প্রথম আনুষ্ঠানিক ও সক্রিয়ভাবে মুসলিম রীতি প্রবিষ্ট করে। সিংহাসন উদ্ধার করার পর নরমিখলা চার বছর (১৪৩০-১৪৩৪ খ্রি.) রাজত্ব করেন। এ সময় থেকে আরাকানরাজ নরমিখলা গৌড়ের মুসলমান সুলতানদের মত তাঁদের মুদ্রার এক পৃষ্ঠায় ফারসী অক্ষরে ইসলামী ‘কলেমা’ ও মুসলমানী নাম লেখার রীতি চালু করেন। গৌড়ের মুসলমান সুলতানদের প্রভাব বশতঃই নরমিখলা তাঁর রাজ্যে এই রীতি চালু করেছিলেন, যেহেতু গৌড়ে তিনি মুসলমান সুলতানের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে ছিলেন দীর্ঘ ২৪ বছর। নরমিখলার পরবর্তী রাজারাও মুদ্রার এক পৃষ্ঠে ফারসী অক্ষরে ইসলামী ‘কলেমা’ ও অপর পৃষ্ঠায় তাঁর বৌদ্ধ নাম ব্যবহার করতেন। এর সঙ্গে একটি করে মুসলমানী নামও ব্যবহার করতেন। ১৪৩০ থেকে ১৬৪৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইসলামী নাম, উপাধি গ্রহণ করেছিলেন আরাকানের ১৭ জন রাজা।  শুধু আরাকানের রাজারাই নন, রাজ-অমাত্যবর্গ, সৈন্যবিভাগের প্রধান থেকে শুরু করে প্রত্যেক বিভাগের প্রধান কর্মচারীরাও মুসলমানী নাম গ্রহণ করেছিলেন। নানা বর্ণে ও নানা রঙে উন্নত ইসলামী সংস্কৃতির প্রভাব আরাকানের অনুন্নত বৌদ্ধসংস্কৃতির ধারক ও বাহক শাসকগোষ্ঠী আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। আরাকান রাজ দরবারই কেবল নয়, সমগ্র আরাকান ও চট্টগ্রামব্যাপী তখন ইসলামী সংস্কৃতির প্রভাবে ভরপুর হয়ে যায়। এই সকল বৌদ্ধারাজাদের যাঁরা অমাত্য, মহাজন, পাত্র-মিত্র, সৈনাধ্যক্ষ ছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন মুসলমান। আরাকানের রাজধানী ম্রোহং অঞ্চলে বসবাসরত প্রায় সবাই ছিলেন বাঙালি ও ধর্মান্তরিত মুসলমান। এ সকল বাঙালি ধর্মান্তরিত মুসলমানদের মধ্যে থেকেই রোসাঙের বৌদ্ধ রাজারা তাঁদের অমাত্য-মহাজন, পাত্র-মিত্র নিয়োগ করতেন।

আরাকানে মুসলিম শাসন প্রাধান্য পাবার ফলে ম্বো, মিঙ্গান, কালাডন, মায়ু, নাফ প্রভৃতি নদীর উভয় তীরে মুসলিম জনপদ গড়ে ওঠে এবং মুসলিম আধিপত্য ও উপনিবেশ স্থাপিত হয়। সুফী-পীর-দরবেশরাই এখানে ইসলাম প্রচার করেন।  রাজনীতি, সমরনীতি, দরবারী আদব-কায়দায় ইসলামী রীতি-পদ্ধতি অনুস্মরণ করা হতো। তাছাড়া সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনেও ইসলামী প্রভাব পরিলক্ষিত হতো। আরাকানে যে পর্দাপ্রথার প্রচলন শুরু হয়Ñ তা খাঁটি আরবীয় মুসলমানদের সংস্রবের ফল। নৌ-বিদ্যায় প্রাচীনকালে আরবীয় মুসলমান বণিকদেরই একছত্র আধিপত্য ছিল। আরাকানের বিভিন্ন স্থানের আরবী নাম, চট্টগ্রামীভাষায় কথ্য-রীতিতে আরবী শব্দের প্রয়োগ, সবই আরবীয় প্রভাব প্রসূত। সাহিত্য সাধনার ক্ষেত্রে আরাকান রাজদরবারের কবিরা ছিলেন ইসলামী সংস্কৃতির উপাসক। কিন্তু আরাকান রাজদরবারাশ্রিত মুসলমান কবিরা কেবল সংস্কৃতি নয়, হিন্দী, আরবী, ফারসী প্রভৃতি উন্নত ভাষা-সাহিত্য থেকে অনুবাদ করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতি সাধন করেন। বাংলা সাহিত্যে মানবীয় প্রেমকে কেন্দ্রীয় শক্তিরূপে পরিকল্পনা করে সাহিত্য রচনার পথিকৃৎ মূলত আরাকান রাজসভার কবিরাই। ১৬২২ হতে ১৬৮৪ খ্রিস্টাব্দ অর্থাৎ মাত্র,ছেষট্টি বছরের মধ্যে,আরাকান রাজসভায় বাঙ্গালা ভাষাও সাহিত্যের যে সর্ব্বোতোমুখী বিকাশ সাধিত হয়,তার তুলনা বাঙ্গালা ভাষার আপন গৃহেও মিলে না।  প্রকৃতপক্ষে আরাকান রাজসভার বাংলা সাহিত্য-সংস্কতির এত বৈভব-ঐশ্বর্য, বিষয়-বৈচিত্র্যের বিকাশ মূলত মুসলমানদের অবদানের ফল। কবিরা ছিলেন মুসলমান, সুফীধর্মাবলম্বী সাধক, তাঁদের পৃষ্ঠপোষক, আশ্রয়দাতা-আদেষ্টারাও ছিলেন একই পথের পথিক। তাঁদের কাব্য-রীতির আদর্শ ছিল আরবী-ফারসি। স্থানীয়ভাবে হিন্দু-বৌদ্ধ প্রভাবও তাতে দুর্লক্ষ্য নয়।

১৪৩০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময় কালে আরাকানের বৌদ্ধ রাজারা তাঁদের রাজ্য শাসন ব্যবস্থার কাজে বিজ্ঞ মন্ত্রী ও সুদক্ষ উচ্চ পদস্থ কর্মচারী নিযুক্ত করে বিজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে তাঁরা জাতি-ধর্ম বিচার না করে প্রধানত নিকটতম প্রতিবেশী ও তাঁদের অধিকৃত রাজ্যাংশ মুসলমানদেরই হাতে আরাকানের সামরিক বিভাগ পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত করেন। প্রত্যেক প্রশাসনিক বিভাগের প্রধান পদে নিযুক্ত করা হয়েছিল মুসলমান। তখনকার রোসাঙ্গের মুসলমান মন্ত্রী ও উচ্চ পদস্থ রাজকর্মচারীদের অধিকাংশের নাম অধুনা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। শুধু  আরাকান প্রবাসী, বাঙালি কবি দৌলত কাজীর -সতীময়না, কবি  আলাউলের- পদ্মাবতী, সয়ফুল মুল্লুক বদিউজ্জমান, সপ্ত পয়কর, সিকান্দর নামা, তোহফা, লোর চন্দ্রানী ও কবি মরদনের-নসিবনামা সূত্রে কিছু সংখ্যক রাজকর্মচারীর নাম জানা যায়।

আরাকান রাজ থিরি-থু-ধর্ম্মার (১৬২২-৩৮ খ্রিঃ) সমর সচিব (লস্কর উজির) ছিলেন আশরাফ খাঁ। তিনি চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানার চারিয়া গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। আরাকানের রাজধানী রোসাঙ্গে তাঁর পাকাবাড়ির ধ্বংসাবশেষ ও একটি দীঘি এবং রাউজান থানার কদরপুর গ্রামে তাঁর লস্কর উজিরের দীঘি আজো বিদ্যমান। রাজা নরপথিগ্যির (১৬৩৮-১৬৪৫ খ্রি) মন্ত্রী ছিলেন মুসলমান বড় ঠাকুর। বড় ঠাকুরের পুত্র মাগন ঠাকুরও অন্যতম মন্ত্রীপদে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি কবি আলাউলের আশ্রয়দাতা ও ‘পদ্মাবতী’ এবং ‘সয়ফুল মুলুক বদিউজ্জমান’ কাব্যের পৃষ্টপোষক ছিলেন। রাজা নরপথিগ্যি মন্ত্রী মাগন ঠাকুরকে এমন বিশ্বাস ও øেহ করতেন যে, মৃত্যুকালে তিনি নিজের একমাত্র অবিবাহিত কন্যার তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব তাঁর হাতে তুলে দিয়ে যান। ১৬৪৫ খ্রিস্টাব্দে রাজা নরপথিগ্যির মুত্যু হয়। রাজ পরিবারের শুভাকাঙ্খী মাগন ঠাকুর রাজার বংশরক্ষার অভিপ্রায়ে রাজকুমারীর সঙ্গে রাজভ্রাতুষ্পুত্র থাদো মিন্তর ওরফে থিরি থু ধম্মার সাথে  বিয়ে দেন এবং থিরি থু ধম্মাকে সিংহাসন দান করেন। এ সময় মাগনকে কৃতজ্ঞ রাজদম্পতি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন। এবং মাগন ঠাকুর রাজা সদো মিন্তর ওরফে থিরি থু ধম্মার প্রধান মন্ত্রী পদে নিযুক্ত হন। মহাকবি আলাউল আরাকান রাজ্যের রাজধানী রোসাঙ্গে আগমনের প্রথম দিকে রাজা থিরি থু ধম্মার অশ্বারোহী সেনাবাহিনীর সৈনিক ছিলেন।

থিরি থু ধম্মার মৃত্যুর পর তৎপুত্র সান্দা-থু- ধর্মা (১৬৫২-৮৪ খ্রিঃ) আরাকানের রাজা হন। সপ্তদশ শতকে আরাকান রাজসভায় মুসলমান প্রভাব এতই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, রাজাদের অভিষেকে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা পৌরহিত্য না করে সেখানকার রাজসভায় মুসলমান মন্ত্রীরা পৌরহিত্য করতেন। রোসাঙ্গ রাজ সান্দা-থু-ধর্মার (১৬৫২-১৬৮৪ খ্রিঃ) অভিষেকে তদীয় মুসলমান প্রধানমন্ত্রী নবরাজ মজলিশ শপথ বাক্য পাঠ করান। সান্দা-থু-ধর্মার তখন অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছিলেন। রাজমাতা মাগন ঠাকুরকে প্রধান মন্ত্রী পদে বহাল রেখে নিজে বালক পুত্রের প্রতিনিধি রূপে আরাকান শাসন করেছিলেন। পিতা-পুত্র এবং মন্ত্রী বড় ঠাকুর ও মাগন ঠাকুর ছিলেন চট্টগ্রামের চক্রশালা নিবাসী আরব্য বংশোদ্ভুত। মাগন ঠাকুর শুধু মন্ত্রী ছিলেন তা নয়, তিনি কাব্য রচনায়ও পারদর্শী ছিন্ন। তাঁর রচিত কাব্যের নাম ‘চন্দ্রবতী’। ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সুবেদার শাহ সুজা আরাকানের রাজধানী রোসাঙ্গে আশ্রয় গ্রহণের কিছু দিন আগেই মাগন ঠাকুর পরলোক গমণ করেন। তখন সোলায়মান নামক এক ব্যক্তি রাজা সান্দা-থু-ধর্ম্মার প্রধানমন্ত্রী পদে নিযুক্ত হন। সম্ভবত তিনি অল্প কয়েক বছরের মধ্যে পরলোক গমণ করেন। তাঁর শুন্যপদ পূরণ করেন নবরাজ মজলিশ নামক এক মুসলমান। সান্দা-থু-ধর্ম্মার সমর সচিব ছিলেন সৈয়দ মোহাম্মদ খাঁ এবং অপর মন্ত্রী রূপে নিযুক্ত ছিলেন সৈয়দ মুসা। সৈয়দ মুসার বাড়ি ছিল সিলেট জেলার হবিগঞ্জের লস্করপুর গ্রামে। সান্দা-থু-ধর্ম্মার আমলে আরাকানের রাজকোষ ও সাধারণ শাসনভার মুসলমান প্রধানমন্ত্রীর দ্বারা এবং দেওয়ানী ও ফৌজদারী বিচার মুসলমান কাজী দ্বারা সম্পাদিত হত। সউদ শাহ নামক এক ব্যক্তি আরাকানের কাজী ছিলেন।  নসরুল্লাহ খোন্দকার বিরচিত ‘শরিয়ত নামা’ (রচনাকাল ১৭৫৫ খ্রিঃ) কাব্যসূত্রে জানা যায় যে, কবি নসরুল্লা খোন্দকারের উর্ধ্বতন অষ্টম পুরুষ হামিদুদ্দিন গৌড়ের উজির ছিলেন। তিনি গৌড় থেকে আরনাকান রাজ্যে চলে আসলে তাঁকে আরাকান রাজ সমর সচিব পদে নিযুক্ত করেন।  সমর সচিব থাকা কালে হামিদ উদ্দিন আরাকানের রাজধানী রোসাঙ্গে প্রথম অশ্বারোহী বাহিনী গঠন করে সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করেছিলেন। আরাকান রাজাদের ইতিপূর্বে অশ্বারোহী সেনাবাহিনী ছিল না। আরাকানের রাজধানী রোসাঙ্গে অশ্বারোহী সেনাবাহিনী মুসলমান সৈনিকদের নিয়ে গঠিত ছিল। হামিদ উদ্দিনের পুত্র বোরহানুদ্দিনও পিতার আহবানে সপরিবারে গৌড়রাজ্য ত্যাগ করে আরাকানের রাজধানী রোসাঙ্গে চলে আসেন। তিনিও আরাকানের সেনাবাহিনীর সেনাপতির দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর পুত্র-প্রৌত্ররাও আরাকানের সেনাবিভাগে নিযুক্ত ছিলেন। কবি আবদুল করিম খন্দকারের প্রপিতামহ রমসুল মিয়া আরাকান রাজ্যের ‘বিষয় পদবী’ পেয়ে সমুদ্রপথে বাণিজ্য-তরীর হাসিল উসুলকারী বা ট্যাক্স কালেক্টর রূপে কাজ করেন। পিতামহ মছন আলী আরাকান রাজসরকারের দোভাষী ইন্টারপ্রেটর রূপে রাজা ও বিদেশী বণিকদের মধ্যে পারষ্পরিক কথোপকথনের অনুবাদকের কাজ করেন। আতিবর নামে একজন চট্টগ্রামী মুসলমান আরাকান শাসনাধীন চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক ছিলেন এবং একই সাথে তিনি চট্টগ্রাম টাকশালের দায়িত্বেও নিযোজিত ছিলেন। ঐ সময় মোহর আলী নামক এক রোহিঙ্গা মুসলমান আরাকান রাজের মন্ত্রী ছিলেন। এছাড়া আরাকান রাজাদের চারজন রোহিঙ্গা মুসলমান সেনাপতির নাম ঐতিহাসিকভাবে পাওয়া যায়।  সেনাপতিরা হলেন সৈয়দ আলম লস্কর, কাইয়ের হ্রেলা, বলদি পাড়ার বুমিং ও বন্দরের আলীয়া বাইং।

১৬৯০ থেকে ১৭১০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিশ বছর কাল আরাকানের রাজাদের মুসলমান দেহরক্ষী ও প্রসাদরক্ষী বাহিনী ‘কামানচিরা’ রাজনীতিতে এতদুর শক্তিশালী হয়েছিল যে, সেসময় কামানচিরা আরাকান রাজ্যের কিং মেকারের ভুমিকা পালন করেছিল। তারা আরাকানের রাজ পরিবারের সদস্যবর্গের মধ্যে থেকে যখন যাকে ইচ্ছে রাজসিংহাসনে বসাত কিংবা পদচ্যুত করার ক্ষমতা রাখতেন।

১৭৩৭ খ্রিস্টাব্দে খন্তার বা কৎবা অথবা কত্তিয়া নামে সুপরিচিত একজন রোহিঙ্গা মুসলমান কিছুদিন আরাকানের ুনংহাসনে আরোহন করে আরাকান রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন। পরাগল খানের সময় থেকেই রাস্তি খানের বংশধর (১৫১৭ খ্রিঃ) হামজা খান, নসরত খান, জালাল খান, ইব্রাহিম খান (১৫৮০ খ্রিঃ) আরাকান অধিকৃত চট্টগ্রামের শাসনকর্তা বা উজির ছিলেন। এসব তথ্য-উপাত্তের আলোকে স্পষ্টই বলা যায়Ñআরাকান রাজ্যের হাজার বছরের ইতিহাসের পড়তে পড়তে রয়েছে মুসলমানদের ইতিহাস।

১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আরাকান আগাগোড়াই ছিল একটা পৃথক রাজ্য। এই রাজ্যের আয়তন ছিল ২২ হাজার বর্গমাইল। আরাকান বর্তমান বার্মার/ মিয়ামারের মূল ভূখণ্ড থেকে একটা বিচ্ছিন্ন ভূভাগ। এর পশ্চিমে রয়েছে সুউচ্চ আরাকান পর্বতমালা বা আরাকান য়োমা (য়োমা মানে পর্বত)। এই পর্বত মালার মধে রয়েছে তিনটি গিরিপথ। যার মধ্যে দিয়ে বার্মা রাজ্যের সাথে যাতাযাত করা সহজ ছিল না। যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল সাগর পথে জাহাজ যোগে। বলতে গেলে বার্মা রাজ্যটি আরাকান থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন অন্য একটি রাজ্য।  আরাকান রাজপরিবারের অভ্যন্তরিণ ষড়যন্ত্রের  সুযোগে তথা আরাকান রাজপরিবারের এক পক্ষের আত্মগাতি ষড়যন্ত্রে  ১৭৮৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর স্বাধীন আরাকান রাজ্য দখল করে বার্মার রাজা বোধপায়া। ঐ সময় আরাকান রাজ ‘থামাদা’ সপরিবারে বর্মী বাহিনীর হাতে নিহত হন। বর্মি সৈন্যরা বন্দি ২০ হাজার আরাকানী সৈন্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। একই সাথে হত্যা করে দু’লাখ নারী-পুরুষকে। আরো প্রায় দু লক্ষ আরাকানীকে দাস হিসেবে বার্মায় প্রেরণ করে। বন্দী দাসদের সিংহভাগই ছিল রোহিঙ্গা মুসলমান। যারা এইসব হত্যাযজ্ঞ হতে অব্যাহতি লাভের আশায় জঙ্গলে পালিয়েছিল তাদেরও অনেককে বর্মী সৈন্যের হাতে, নয় বাঘের মুখে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছিল। দখল করার পর বোধপায়া আরাকানকে বার্মার সাথে একীভূত করে বার্মার একটি প্রদেশে পরিণত করে। তখন থেকেই আরাকানীদের দুর্ভোগ শুরু হয়। যারা  জোড় পূর্বক আরাকান রাজ্য দখল করেছে, তারাই আজ আরাকানের ভূমিপুত্র রোহিঙ্গা জাতিকে নিধন করছে। এবং ঐ বহিরাগত বর্মীরাই আরাকানের ভূমিপুত্র রোহিঙ্গাদের বলছে বহিরাগত।

 

জামাল উদ্দিন : গবেষক, লেখক ও প্রকাশক

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>